দেশের ব্যবসায়ীদের ভ্যাট ফেরতের অর্থ আটকে থাকার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের দাবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড ব্যবস্থা অকার্যকর থাকায় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। একই কারণে নতুন করেও অনেক প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ফেরতের আবেদন জমা দিতে পারছে না।
তবে বিপুল পরিমাণ এই দাবির বিষয়ে এনবিআরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। তাদের মতে, এত বড় অঙ্কের ভ্যাট ফেরতের দাবি স্বাভাবিক কি না, তা আগে যাচাই করা প্রয়োজন। কিছু ক্ষেত্রে পণ্যের বিক্রয়মূল্য বা মূল্য সংযোজন কম দেখানোর মাধ্যমে অতিরিক্ত ফেরতের দাবি করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করছেন তারা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ভ্যাট ফেরতের আবেদন এখন পুরোপুরি অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে করার নিয়ম চালু হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সেই রিফান্ড মডিউল কার্যকর না থাকায় আবেদন করার সুযোগই বন্ধ হয়ে আছে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধা ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করে, তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে।
গত বছরের নভেম্বর থেকে ভ্যাট ফেরতের আবেদন অনলাইন সিস্টেমে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এরপর থেকে ম্যানুয়াল আবেদন গ্রহণের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সংশ্লিষ্ট মডিউল সক্রিয় না থাকায় আইন অনুযায়ী প্রাপ্য অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়াই কার্যত থেমে গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভ্যাট আইনে ফেরতের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে তারা সেই সুবিধা নিতে পারছেন না। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অঙ্কের অর্থ আটকে থাকছে, যা ব্যবসার নগদ অর্থ প্রবাহে চাপ তৈরি করছে।
ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী পরিচালক নাইমুল হুদা জানান, তাদের প্রায় ১২ কোটি টাকার ভ্যাট ফেরতের দাবি ২০১৯ সাল থেকে আটকে রয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি এখন না সিস্টেমে এন্ট্রি দিতে পারছে, না ম্যানুয়ালি অগ্রিম কর (এটি) ফেরতের আবেদন করতে পারছে।
ভ্যাট পরামর্শক মো. দাউদ ফারায়িজ বলেন, শুধু অনুমোদনের বিষয় নয়, বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান আবেদনই জমা দিতে পারছে না। তার মতে, আইন অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফেরতের আবেদন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এনবিআরের পক্ষ থেকে আবেদন গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
ভ্যাট ব্যবস্থায় কোনো প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত অগ্রিম কর সমন্বয় করার সুযোগ থাকে। রিটার্নে সমন্বয়ের পরও উদ্বৃত্ত থাকলে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে নগদ ফেরতের আবেদন করা যায়। কিন্তু বর্তমানে রপ্তানিকারক, স্থানীয় উৎপাদনকারী, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ভিত্তিক রপ্তানিকারকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা নিতে পারছে না।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অগ্রিম কর ফেরতের প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ করা হয়েছে। তবে রপ্তানি ও স্থানীয় উৎপাদনকারীদের ভ্যাট ফেরতের দাবিগুলো যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সেগুলো আটকে আছে।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ দাবির মধ্যে সবগুলো সঠিক কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি। তাদের আশঙ্কা, কিছু প্রতিষ্ঠান পণ্যের প্রকৃত মূল্য সংযোজন বা বিক্রয়মূল্য যথাযথভাবে না দেখিয়ে অতিরিক্ত ফেরত দাবি করতে পারে।
তবে ব্যবসায়ী মহলের দাবি, এই বিশাল অঙ্কের দাবি একদিনে তৈরি হয়নি। গত ছয় বছর ধরে নিয়মিত ফেরত না পাওয়ার কারণেই অর্থের পরিমাণ এত বড় হয়েছে। দাউদ ফারায়িজের মতে, প্রতিবছরের হিসাব আলাদাভাবে বিবেচনা করলে দাবির পরিমাণ এত অস্বাভাবিক মনে হতো না।
এনবিআর ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর ইন্টিগ্রেটেড ভ্যাট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সিস্টেম এবং বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে অনলাইন ভ্যাট ফেরত ব্যবস্থা চালু করে। একই সঙ্গে ম্যানুয়াল আবেদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। নতুন ব্যবস্থায় ফেরত প্রক্রিয়ার জন্য ২৭টি শর্তের একটি তালিকাও যুক্ত করা হয়।
কিন্তু বর্তমানে অনলাইন রিফান্ড মডিউল সচল না থাকায় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিজিটাল ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের প্রাপ্য অর্থ ফেরত পেতে দীর্ঘ অপেক্ষায় রয়েছে।
ভ্যাট ফেরত আটকে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যাপেক্স ইয়ার্ন ডাইং, ইস্পাহানি টি, ডিবিএল সিরামিকস, সিইএটি একে খান, কেএসআরএম, কনফিডেন্স গ্রুপ, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, আবুল খায়ের কনজ্যুমার প্রোডাক্টস, বিএসআরএম ওয়্যারসসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে ব্যবসায়ীদের ন্যায্য পাওনা দ্রুত পরিশোধ করা প্রয়োজন, অন্যদিকে ভুয়া বা অতিরিক্ত দাবির ঝুঁকি ঠেকাতে কার্যকর যাচাই ব্যবস্থাও জরুরি। তবে দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অচল থাকায় রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

