দেশের অন্যতম ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাত বড় অঙ্কের ঋণের চাপ সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা চেয়েছে। প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার দায় পুনর্গঠন ও ঋণ পুনঃতফসিলের প্রক্রিয়া সহজ করতে প্রতিষ্ঠানটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে চার মাসের জন্য কিছু নিয়ম শিথিল করার আবেদন জানিয়েছে।
জিপিএইচ ইস্পাত জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোর সঙ্গে চলমান ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে এবং স্বাভাবিক ব্যবসা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ঋণ তথ্যভান্ডার বা সিআইবি সংক্রান্ত কিছু জটিলতা নতুন অর্থায়ন পাওয়া এবং কার্যকরী মূলধন ব্যবস্থাপনায় বাধা তৈরি করছে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি চার মাসের জন্য সিআইবি সংক্রান্ত শর্ত শিথিল বা ছাড় দেওয়ার অনুরোধ জানায়। জিপিএইচ ইস্পাতের দাবি, এই সময় প্রয়োজনীয় নথিপত্র সম্পন্ন করা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেওয়া এবং ঋণ পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
সিআইবি হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালিত একটি কেন্দ্রীয় ঋণ তথ্যভান্ডার, যেখানে ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক ইতিহাস সংরক্ষিত থাকে। কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন ঋণ বা ব্যাংক সুবিধা নিতে চাইলে ব্যাংকগুলো সাধারণত এই তথ্য যাচাই করে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের সিআইবি অবস্থান নতুন অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জিপিএইচ ইস্পাতের মোট দায় রয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণ দুই ডজনের বেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, আর্থিক পুনর্গঠন পরিকল্পনার মাধ্যমে তারল্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, বকেয়া পরিশোধ নিয়মিত করা এবং উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা তাদের প্রধান লক্ষ্য। তারা দাবি করেছে, এই উদ্যোগ কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নয়; বরং ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য নেওয়া হয়েছে।
জিপিএইচ ইস্পাতের বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি বৈঠকও হয়েছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর গভর্নরের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল এবং একটি সমন্বিত ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
এরপর ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠানটির মোট দায় পর্যালোচনা করে বাস্তবসম্মত পুনর্গঠন পরিকল্পনা তৈরি করা।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়া এবং নতুন কার্যকরী মূলধন সহায়তার বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে।
জিপিএইচ ইস্পাতের আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক দশকে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র দুইবার ১০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে। একই সময়ে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে মুনাফার হার বেশির ভাগ সময় ৫ শতাংশের নিচে ছিল।
প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের শেষে জিপিএইচ ইস্পাতের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ছিল ৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ ছিল ২ হাজার ৮০২ কোটি টাকা।
অন্যদিকে গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৯৪০ কোটি টাকায় নেমে আসে। বিক্রি কমলেও প্রতিষ্ঠানটি ৩ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যেখানে আগের বছর ২৪ কোটি টাকা লোকসান হয়েছিল।
জিপিএইচ ইস্পাত ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ৮ লাখ ৪০ হাজার টন মাইল্ড স্টিল বিলেট এবং ৬ লাখ ৪০ হাজার টন এমএস রড ও মাঝারি আকারের স্টিল পণ্য উৎপাদনের।
তবে দেশের ইস্পাত খাত সামগ্রিকভাবেই চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে মোট ইস্পাত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টন হলেও প্রকৃত চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক ধীরগতি, বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং নির্মাণ খাতের দুর্বলতার কারণে ইস্পাত শিল্পে চাহিদা কমেছে। ফলে বড় ঋণের বোঝা বহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তারল্য সংকটে পড়ছে।
জিপিএইচ ইস্পাতের মতো বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনর্গঠন এখন শুধু একটি কোম্পানির বিষয় নয়, বরং দেশের শিল্প খাতের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তবে ঋণ সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বাজার চাহিদা এবং উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

