নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দিলে কর ছাড়ের সুবিধা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগে ব্যাপক সাড়া মিলেছে। চলতি ২০২৬-২৭ করবর্ষের প্রথম তিন মাসে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের আয়কর রিটার্ন জমার সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৭ শতাংশ বেড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১২ লাখ ৫৩ হাজার করদাতা তাদের আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন।
কর কর্মকর্তারা মনে করছেন, আগাম রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য দেওয়া বিশেষ প্রণোদনাই এই বড় ধরনের বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সরকারের নতুন উদ্যোগের আওতায় ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
আগে অনেক করদাতা নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে রিটার্ন জমা দিতেন। তবে এবার কর ছাড়ের সুযোগ থাকায় অনেকেই সময়ের আগেই রিটার্ন জমা দিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, এই উদ্যোগ করদাতাদের মধ্যে সময়মতো কর পরিশোধের প্রবণতা বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ৩ লাখ করদাতা এই কর ছাড়ের সুবিধা গ্রহণ করেছেন। নতুন ব্যবস্থায় একজন করদাতা প্রদেয় করের ওপর সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ৫ শতাংশ ছাড় পেতে পারেন। এই ছাড় সরাসরি করদাতার মোট কর দায়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের কাছ থেকে ৭ লাখ ৯ হাজার আয়কর রিটার্ন জমা পড়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৫৩ হাজারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রিটার্ন জমার পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগকে আয়কর ব্যবস্থায় স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। করদাতাদের নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দেওয়ার অভ্যাস তৈরি হলে ভবিষ্যতে রাজস্ব সংগ্রহ আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে পারেননি, তাদের জন্য কোনো কর ছাড় রাখা হয়নি। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জমা দেওয়া রিটার্নের ক্ষেত্রে এই প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে না।
এদিকে দেরিতে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে জরিমানার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ২ শতাংশ অথবা ৩ হাজার টাকা—যেটি বেশি হবে, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে। আর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে জরিমানার পরিমাণ বেড়ে প্রদেয় করের ৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা—যেটি বেশি হবে, সেটি দিতে হবে।
ক্ষুদ্র করদাতাদের মধ্যেও এই কর ছাড়ের বিষয়টি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইসমাইল ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়ে ২০ হাজার টাকা কর দায়ের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার টাকা ছাড় পেয়েছেন। তিনি জানান, সরকারের দেওয়া ছাড়ের কারণে তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রিটার্ন জমা দিতে উৎসাহিত হয়েছেন।
তার মতে, ছাড়ের পরিমাণ খুব বেশি না হলেও সময়মতো কর পরিশোধের জন্য এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। বিশেষ করে ছোট করদাতাদের জন্য এই ধরনের সুবিধা কর ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর ছাড়ের মতো প্রণোদনা স্বল্পমেয়াদে রিটার্ন জমার সংখ্যা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী কর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে করদাতাদের জন্য সহজ প্রক্রিয়া, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সরকারের লক্ষ্য শুধু বেশি সংখ্যক রিটার্ন সংগ্রহ নয়, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে কর দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করা। এবারের ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি সেই প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

