বিশ্ব অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি, সার্বিক প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের যৌথ বার্ষিক সম্মেলন শুরু হতে যাচ্ছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে। আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী আয়োজিত এই বৈশ্বিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করছেন বিশ্বের ১৯১টি সদস্য দেশের প্রায় ১৫ হাজারের বেশি নিবন্ধিত প্রতিনিধি। বিশ্ব অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারক, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, অর্থমন্ত্রী, নীতি বিশ্লেষক এবং শীর্ষ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধানদের এই উপস্থিতিকে ঘিরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র ব্যাংকক এখন পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
বিশাল এই আন্তর্জাতিক ইভেন্ট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ব্যাংককজুড়ে কড়া যানজট নিয়ন্ত্রণ ও বিশেষ লজিস্টিক প্রটোকল চালু করেছে থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় সরকার। সম্মেলনের মূল ভেন্যু এবং শহরের কেন্দ্রস্থলে যান চলাচলের স্বাভাবিক চাপ কমাতে ১২, ১৪ ও ১৫ অক্টোবর ব্যাংকক মেট্রোপলিটন এলাকার সরকারি কর্মচারীদের ঘরে বসে কাজ বা ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ১৩ অক্টোবর থাইল্যান্ডের নির্ধারিত সরকারি ছুটি পালিত হবে এবং ১৬ অক্টোবর সরকার একটি বিশেষ সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে, যেদিন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। প্রশাসন বেসরকারি ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন সংস্থাকেও এই বিশেষ কাজের সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছে।
সম্মেলনে অংশ নেওয়া ভিআইপি প্রতিনিধি এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে থাই পুলিশ প্রশাসন। প্রতিনিধিদের থাকার জন্য নির্ধারিত প্রধান ২১টি পাঁচ তারকা হোটেল এবং সম্মেলনের ভেন্যু রানী সিকিরিট ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টার ঘিরে একটি উচ্চ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। থাইল্যান্ডের ট্যুরিজম পুলিশ ব্যুরোর দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় ৫০০ জন বিশেষ প্রশিক্ষিত পর্যটন পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা সাদাপোশাকে টহল প্রদান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বিশেষ ড্রোন দিয়ে আকাশপথে পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক সফরসঙ্গীদের স্পেশাল মোটরকেড প্রটোকল দেবেন। এই সার্বিক নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনায় বিশ্বজুড়ে ৩৯টি দেশের কেন্দ্রীয় দূতাবাসের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
এবারের সম্মেলনে বিশ্বের একাধিক আন্তর্জাতিক পরাশক্তি ও উদীয়মান অর্থনীতির শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধানরা সরাসরি অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট গি পারমেলিনের থাইল্যান্ড সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দীর্ঘ ২২ বছর পর সুইজারল্যান্ডের কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট সরকারি সফরে থাইল্যান্ডে পা রাখছেন। সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের অত্যন্ত প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নমসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা সরাসরি নীতি নির্ধারণী সেশনগুলোতে অংশ নেবেন। থাইল্যান্ডের অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের এই সফর এবং অতিথি আপ্যায়ন খাত থেকে থাই অর্থনীতিতে প্রায় ১০৫ কোটি থেকে ২২৫ কোটি থাই বাথ সমপরিমাণ নতুন মূলধন যুক্ত হতে যাচ্ছে। এছাড়া স্থায়িত্ব ও পরিবেশগত সুরক্ষার বার্তা দিতে সম্মেলন চলাকালে অতিথিদের যাতায়াতের জন্য ৩২০টিরও বেশি সম্পূর্ণ ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) বা বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের বিশেষ ব্যবস্থা করেছে আয়োজক দেশ।
বড় এই আন্তর্জাতিক আয়োজন সফলভাবে শেষ করার ক্ষেত্রে একমাত্র প্রধান প্রাকৃতিক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিরূপ আবহাওয়া। ব্যাংকক মেট্রোপলিটন অথরিটি এবং স্থানীয় আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, ১০ ও ১১ অক্টোবর ব্যাংককসহ পার্শ্ববর্তী প্রদেশগুলোতে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। কিছুদিন আগে মাত্র তিন দিনে ৩২০ মিলিমিটার বা প্রায় সাড়ে ১২ ইঞ্চি রেকর্ড বৃষ্টিপাতের দরুন ব্যাংককের নিম্নঞ্চল জলমগ্ন হয়ে দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। এবারও ভারী বর্ষণে সাময়িক জলাবদ্ধতা তৈরি হলেও তা দ্রুত নিষ্কাশন করে সম্মেলন কেন্দ্র ও বিমানবন্দরগামী সড়কগুলো চলাচলের উপযোগী রাখতে বিশেষ জরুরি কন্টিনজেন্সি দল মাঠে নামানো হয়েছে।

