মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের মধ্যে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে রোগ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশে বড় ধরনের একটি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক ২২৫ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের পরিকল্পনা করেছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওয়ান হেলথ পদ্ধতিতে স্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি, মোকাবিলা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি’। এর মাধ্যমে মানুষের পাশাপাশি প্রাণী ও পরিবেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া সংক্রামক রোগ দ্রুত শনাক্ত করা এবং নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরিকল্পনা কমিশনের প্রাথমিক অনুমোদনের পর বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অর্থায়ন চুক্তির চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে প্রকল্পটি সংশোধন করে পুনরায় অনুমোদনের জন্য জমা দিতে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ২ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর একটি অংশ বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত ২২৫ মিলিয়ন ডলারের ঋণ থেকে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা যুক্ত থাকবে। পুরো কার্যক্রমের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
বর্তমানে মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অনেক ক্ষেত্রে আলাদা আলাদাভাবে পরিচালিত হয়। ওয়ান হেলথ পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো এই তিনটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে যুক্ত করে সমন্বিতভাবে কাজ করা।
এই উদ্যোগের আওতায় রোগ নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা উন্নত করা, গবেষণাগারের সক্ষমতা বাড়ানো এবং জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি উন্নত করা হবে।
বিশেষ করে প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন রোগ বা জুনোটিক রোগ মোকাবিলায় এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে গবাদিপশু, বন্যপ্রাণী ও মানুষের মধ্যে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। এসব রোগ দ্রুত শনাক্ত করা গেলে বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাণী ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে রোগ পর্যবেক্ষণ, পশু চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সীমান্ত অতিক্রমকারী রোগ মোকাবিলায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে শুধু মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিয়ে বড় ধরনের রোগের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কারণ অনেক সংক্রামক রোগের উৎস প্রাণী বা পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ—এই তিনটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে বিবেচনা করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
প্রকল্পটি দেশের শহর, আধা-শহর ও গ্রামীণ এলাকায় কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ব্যবস্থা উন্নত করা হবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বড় ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব হলে সরকার, পরিবার এবং ব্যবসায়ীদের ওপর ব্যাপক আর্থিক চাপ তৈরি হয়। আগাম শনাক্তকরণ ও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকলে সেই ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প মূল্যায়ন নথিতে পরিবেশগত ঝুঁকি, গবেষণাগারের নিরাপত্তা এবং চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়েও সতর্কতার কথা বলা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বজুড়ে মহামারি ও নতুন নতুন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য ওয়ান হেলথ পদ্ধতি গ্রহণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে এই প্রকল্প কার্যকর হলে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

