জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার বিষয়টি কঠোরভাবে নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। রাষ্ট্রের মূল রাজস্ব আহরণকারী এই সংস্থায় দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা না থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে কর দেওয়ার আগ্রহ কমে যায় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পর পর সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার বিধান যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। তবে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব সরকারি চাকরিজীবীকে বাধ্যতামূলকভাবে সম্পদের হিসাব দেওয়ার নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এনবিআর কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব বিবরণী ঘোষণার বিষয়টি পুনরায় গুরুত্ব পায়। কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান জানিয়েছেন যে বিদ্যমান নিয়ম মেনেই এনবিআরের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে ২০২৫ সালে সংস্থার সব কর্মচারী ও তাদের পরিবার নির্ধারিত নিয়ম মেনেই সম্পদের হিসাব দাখিল করেছে।
তবে কেবল হিসাবের খাতায় সংখ্যা জমা দিলেই যে অনিয়ম ঠেকানো সম্ভব নয়, তার পেছনে রয়েছে অতীতের অসংখ্য তিক্ত অভিজ্ঞতা ও পরিসংখ্যান। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বা সিপিডির এক জরিপে দেখা গেছে যে ২০২২ থেকে ২০২৩ অর্থবছরে কর সেবা নিতে গিয়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান রাজস্ব কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ঘুস দাবির মুখোমুখি হয়েছে এবং ৭২ শতাংশ ব্যবসায়ী কর প্রশাসনে ব্যাপক দুর্নীতির কথা স্বীকার করেছেন। অতীতে এনবিআরের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ ও মাঝারি সারির কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার কিংবা কর মওকুফের মতো গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের মামলা ও বিভাগীয় শাস্তির মতো ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনাগুলোর কারণেই মূলত রাজস্ব বোর্ডের ভেতরের আর্থিক শৃঙ্খলা ও তদারকি নিয়ে জনমনে স্থায়ী সংশয় তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল নিয়মমাফিক সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়াই শেষ কথা নয়, বরং জমা দেওয়া তথ্যের সত্যতা ও অসংগতি যাচাইয়ের জন্য একটি স্বাধীন ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা সবচেয়ে বেশি জরুরি। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন যে অন্যান্য করদাতাদের মতো দৈবচয়নের ভিত্তিতে বা অডিটের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদ যাচাই করা হলে তবেই প্রকৃত স্বচ্ছতা আসবে এবং কারোর হিসাবে গোপন কিছু থাকলে তা প্রকাশ পাবে। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদও একই সুরে মত দিয়ে বলেছেন যে এই প্রক্রিয়াটিকে কোনো বিশেষ সরকারের সাময়িক সিদ্ধান্ত না ভেবে একটি স্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামোর রূপ দিতে হবে, যাতে কর কর্মকর্তারা যাদের আয় ও সম্পদ যাচাই করেন, তাদের নিজেদের সম্পদের হিসাবও একইভাবে নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষিত হয়।
দুর্নীতি দমন এবং কর প্রশাসনের সুশাসন ফেরানোর এই উদ্যোগের পাশাপাশি এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতেও বড় ধরনের সংস্কারের আলোচনা চলছে। দীর্ঘকাল ধরে একই সংস্থার অধীনে কর নীতি প্রণয়ন ও কর সংগ্রহের কাজটি একসঙ্গে হওয়ায় স্বার্থের সংঘাতের তৈরি হয়, যা আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচিত হয়ে আসছে। বর্তমান সরকার রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আলাদা করার পুরোনো উদ্যোগটি পুনর্মূল্যায়ন করতে একটি উচ্চপর্যায়ের সুপারিশ কমিটি গঠন করেছে। শেষ পর্যন্ত সম্পদের সঠিক হিসাব বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি কাঠামোগত এই সংস্কারগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়িত হলে তবেই রাজস্ব বোর্ডের ওপর সাধারণ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের আস্থা স্থায়ীভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।

