চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম কমলেও তার সুফল ভোগ করতে পারছেন না ভোক্তারা। পাইকারিতে দাম কমার বিপরীতে খুচরা বাজারে আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে ভোজ্যতেল। কোথাও কোথাও বোতলজাত তেল নির্ধারিত খুচরা মূল্যের চেয়েও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাজার তদারকির ঘাটতিকে পাইকারি ও খুচরা দামের এই ব্যবধানের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রামের চাক্তাই খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে গত এক সপ্তাহে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ৩ টাকা ১৩ পয়সা এবং পাম তেলের দাম ২ টাকা ৪১ পয়সা কমেছে। ১১ অক্টোবর পাইকারি বাজারে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ১৭৭ টাকা ৩৩ পয়সায়। অথচ খুচরা বাজারে একই তেল বিক্রি হচ্ছে ২১০ টাকায়। অন্যদিকে, পাইকারিতে প্রতি লিটার পাম তেলের দাম নেমে এসেছে ১৫৬ টাকা ৭৫ পয়সায়। খুচরা পর্যায়ে এই তেল বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকায়।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং দর কমে আসা এবং সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে পাইকারি বাজারে তেলের দাম কমেছে। ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী কামরুল হুদা জানান, অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের বুকিং দর গত মাসের প্রতি টন ১ হাজার ২২৩ ডলার থেকে কমে ১ হাজার ২০০ ডলারে নেমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি ব্যয় কমার প্রভাব স্থানীয় পাইকারি বাজারেও পড়েছে বলে জানান তিনি।
তবে পাইকারিতে দাম কমলেও খুচরা বাজারে এর প্রতিফলন দেখা যায়নি।একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে কাজীর দেউড়ি,রিয়াজউদ্দিন বাজার ও চকবাজারের বিভিন্ন দোকানে খোলা সয়াবিন তেল আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। বোতলজাত তেলের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ৫০০ মিলিলিটারের একটি বোতলের গায়ে ১০৪ টাকা লেখা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে ১০৫ টাকায়। একইভাবে, এক লিটারের বোতলে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২০৪ টাকা উল্লেখ থাকলেও ক্রেতাকে দিতে হচ্ছে ২১০ টাকা।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশের ভোজ্যতেলের বাজার আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের দামের পরিবর্তন স্থানীয় বাজারেও প্রভাব ফেলে। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ পাইকারি ও সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিনের মতে, এই বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ পণ্য আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের প্রবণতার সঙ্গে স্থানীয় দামও ওঠানামা করে। তবে পাইকারি পর্যায়ে দাম কমার পর খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন না থাকায় বাজার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশ পূরণ হয় অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেল আমদানির মাধ্যমে। বাকি চাহিদার বড় অংশ আসে চালের কুঁড়ার তেল ও সরিষার তেলের মতো দেশীয় উৎস থেকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ২২ লাখ ২৩ হাজার টন সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। শুল্ক, মূল্য সংযোজন করসহ অন্যান্য ব্যয় যোগ করলে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের পরিবর্তন এবং আমদানি ব্যয়ের ওঠানামা দেশের ভোজ্যতেলের বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত দেশে ৬৫ হাজার ৯৫৬ টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে পাম তেল ৫০ হাজার ৮৯৬ টন এবং সয়াবিন তেল ১৫ হাজার ৬১ টন। আরও তেলের চালান আসার পথে রয়েছে। পাশাপাশি আগের অর্থবছরের মজুতও রয়েছে মিলমালিক ও আমদানিকারকদের হাতে। অর্থাৎ, বাজারে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও খুচরা পর্যায়ে দাম না কমায় ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের সঙ্গে এক বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ভোজ্যতেল ও চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে এবং রমজানের আগে আরও পণ্য দেশে আসার কথা রয়েছে। চাহিদার সময়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীদের সময়মতো ঋণপত্র (এলসি) খোলার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, এমন অনিয়ম ঠেকাতে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা কামনা করেন।
তবে বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভোজ্যতেলের দাম না কমায় সাধারণ পরিবারের বাজেটে চাপ অব্যাহত রয়েছে। ঘাটফরহাদবেগ এলাকার বাসিন্দা ইকবাল চৌধুরী বলেন, আয় প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, রমজান সামনে রেখে কিছু ব্যবসায়ী দাম বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। এ পরিস্থিতিতে বাজার তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্লাহ জানান, বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসব অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। তবে পাইকারি বাজারে দাম কমার সুফল সাধারণ ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে শুধু অভিযান নয়, সরবরাহব্যবস্থা, খুচরা মূল্য নির্ধারণ এবং বিক্রয়মূল্য কার্যকরভাবে তদারকির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

