সরকার দাম সমন্বয় করার পরও দেশের বাজারে রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির সংকট কাটছে না। নতুন নির্ধারিত দামেও অনেক জায়গায় গ্রাহকদের আগের মতোই বেশি অর্থ দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, দাম বাড়ানোর পরও কেন বাজারে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে না এবং এই সংকটের প্রকৃত কারণ কোথায়?
ভোক্তাদের অভিযোগ, এলপিজি সংকটের সময় যে বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে, এখনো অনেক এলাকায় একই দামে কিনতে হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক গ্রাহক।
রাজধানীর মিরপুরের পাইকপাড়ার এক বাসিন্দা জানান, স্থানীয় এক খুচরা বিক্রেতার কাছে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে গেলে তার কাছে ২ হাজার ৪০০ টাকা চাওয়া হয়। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে এত বেশি কেন জানতে চাইলে বিক্রেতা জানান, তার নিজের কেনার দামই ২ হাজার ৩০০ টাকা।
এ পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, যদি এলপিজির দাম বাড়ানো হয়, তাহলে বাজারে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না কেন?
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ দাবি করছে, দেশে এলপিজির আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সংগঠনটির মতে, বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ এলপিজি মজুত রয়েছে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো সুযোগ নেই।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। এর আগের মাস আগস্টে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ দুই মাসের আমদানির পরিমাণ প্রায় কাছাকাছি ছিল।
এলপিজি অপারেটরদের দাবি, দেশের চাহিদার তুলনায় এই সরবরাহ যথেষ্ট। তাই বাজারে যদি কোনো জায়গায় সংকট বা অতিরিক্ত দাম দেখা যায়, তাহলে তা সরবরাহ ব্যবস্থাপনার অন্য কোনো সমস্যার কারণে হতে পারে।
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে এলপিজি না পাওয়া এবং বেশি দামে বিক্রির অভিযোগের পর জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজারে অভিযান শুরু করে। এর পর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন অক্টোবর মাসের জন্য নতুন দাম নির্ধারণ করে।
বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। এর আগে এই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।
তবে দাম বাড়ানোর পরও অনেক এলাকায় গ্রাহকরা নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাচ্ছেন না।
সংকটের শুরু কোথা থেকে?
এলপিজি বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব রয়েছে। গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এর ফলে দেশে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়।
এলএনজি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় লেগে যায়। এই সময় অনেক আবাসিক গ্রাহক রান্নার জন্য এলপিজির ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করেন। ফলে বাজারে এলপিজির চাহিদা বেড়ে যায় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়।
এর মধ্যে ২০ সেপ্টেম্বর সরকার জ্বালানি তেলের দামও বাড়ায়। একই সময়ে এলপিজি ব্যবসায়ীরা দাম সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেন। এরপরই এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু নতুন দাম নির্ধারণের পরও বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় সংকট আরও আলোচনায় আসে।
ব্যবসায়ীরা যা বলছেন
খুচরা বিক্রেতা ও পরিবেশকদের দাবি, তারা নিজেরাই বেশি দামে সিলিন্ডার কিনছেন। রাজধানীর স্বামীবাগ এলাকার এক এলপিজি ব্যবসায়ী জানান, কোম্পানির ডিলারকে আগে টাকা দেওয়ার পরও নিয়মিত সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
তার অভিযোগ, অনেক সময় টাকা জমা দেওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে সিলিন্ডার সরবরাহ করা হয় না।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নেতারা বলছেন, দাম বাড়ানোর পর কোম্পানিগুলো নতুন দামে সিলিন্ডার সরবরাহ শুরু করেছে। কিন্তু আগে দেওয়া অগ্রিম টাকা এবং নতুন দামের সমন্বয় নিয়ে পরিবেশকদের মধ্যে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তাদের মতে, সব কোম্পানির সিলিন্ডার বাজারে সমানভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো একটি কোম্পানির খালি সিলিন্ডার ফেরত নিয়ে একই কোম্পানির গ্যাস দেওয়া সম্ভব হলেও অন্য কোম্পানির সিলিন্ডার দিতে গেলে নতুন করে বোতলসহ কিনতে হয়।
এলপিজি অপারেটরদের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, কোম্পানিগুলো আগের মতোই ডিলারদের সিলিন্ডার সরবরাহ করছে। বেশি দামে বিক্রির বিষয়টি পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের পর্যায়ের সমস্যা বলে দাবি করছে তারা।
আমদানিকারকের সংখ্যা কম, তৈরি হচ্ছে চাপ
এলপিজি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেকের মতে, বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়াও বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বর্তমানে মাত্র ছয়টি প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করছে। আগে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। আমদানিকারকের সংখ্যা বাড়লে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং গ্রাহকরা তুলনামূলক কম দামে গ্যাস পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
তাদের মতে, শুধু দাম সমন্বয় করলেই বাজার স্থিতিশীল হবে না। সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবেশকদের কমিশন, পরিবহন খরচ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলোও সমাধান করতে হবে।
কেন বাড়ছে দাম নিয়ে অসন্তোষ?
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির দাবি, বর্তমানে সরকার নির্ধারিত দামে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বিইআরসিকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, কোম্পানি থেকে গুদাম পর্যন্ত সিলিন্ডার পরিবহন, ওঠানো-নামানো, কর্মচারীর খরচ, গুদাম ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, লাইসেন্স ফি এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তাদের বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।
তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি সিলিন্ডারে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রায় ১৫০ টাকা প্রয়োজন হয়। কিন্তু কমিশনের পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ায় ব্যবসায়ীরা চাপের মধ্যে রয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন কোম্পানির সিলিন্ডারের দামের পার্থক্যও বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন।
অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার
এলপিজি সংকটের মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এমন কিছু দোকানেও সিলিন্ডার বিক্রি করতে দেখা গেছে, যেগুলো মূলত এলপিজি বিক্রির জন্য অনুমোদিত নয়।
মোবাইল রিচার্জের দোকান, সিমেন্টের দোকান, হার্ডওয়্যারের দোকান এবং মুদি দোকানেও কিছু ক্ষেত্রে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংকটের কারণে অনেকেই বাড়তি লাভের আশায় এই ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। তবে এলপিজি অত্যন্ত দাহ্য হওয়ায় এর বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট অনুমোদন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজি সংকটের সমাধান শুধু দাম বাড়ানোর মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা, বাজার তদারকি বাড়ানো এবং আমদানি ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা তৈরি করা।
সরকার নির্ধারিত দামে সাধারণ মানুষ কবে নাগাদ নিয়মিত এলপিজি পাবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ ভোক্তার জন্য শুধু দাম নির্ধারণ নয়, নির্ধারিত দামে পণ্য পাওয়া নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

