পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক’ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এক জটিল ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। গত আগস্ট মাসে চালের বাজারে দাম তুলনামূলক কমে আসায় সার্বিক বা হেডলাইন মূল্যস্ফীতি ৮.৩২ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ৮.২৬ শতাংশে নেমে এলেও সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরেনি। এর প্রধান কারণ হলো, অখাদ্য বা খাদ্যেতর পণ্যের মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপরে আটকে আছে এবং একই সাথে সাধারণ কর্মজীবী মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে নিচে নেমে গেছে। ফলে নিত্যপণ্যের বাজার খরচ মেটাতে গিয়ে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ও জমানো সঞ্চয় আশঙ্কাজনকভাবে ক্ষয় হচ্ছে।
জিইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাইয়ের ৭.১৬ শতাংশের তুলনায় আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৭.০২ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল, যার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রধান খাদ্যশস্য চালের দরপতন। আগস্টে চালের ক্ষেত্রে নেতিবাচক মূল্যস্ফীতি বা দরপতন রেকর্ড করা হয় মাইনাস ৭.৯৯ শতাংশ, যেখানে মোটা চালের দাম কমেছে প্রায় ১১.৮৩ শতাংশ। চাল ছাড়াও পেঁয়াজ ও সবজির বাজারে কিছুটা দাম কমায় খাদ্য খাতে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। তবে ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেছে খাদ্যেতর বা নন-ফুড পণ্যে, যেখানে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে ৯.৩২ শতাংশে উঠে গেছে। খাদ্য ও অখাদ্য খাতের মূল্যস্ফীতির মধ্যে ব্যবধান এখন ২ শতাংশের বেশি, যার ফলে জীবনযাত্রার অন্যান্য খরচ, বিশেষ করে যাতায়াত ও জ্বালানি খরচ গৃহস্থালি বাজেটে বড় ধরনের টান ফেলছে।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকটি হলো মানুষের আয় ও ব্যয়ের ফারাক বৃদ্ধি পাওয়া। আগস্ট মাসে দেশজুড়ে মজুরি বৃদ্ধির হার জুলাইয়ের ৮.২২ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৮.০৫ শতাংশে। অর্থাৎ, পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট সার্বিক মূল্যস্ফীতি যখন ৮.২৬ শতাংশ, তখন সাধারণ শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে ৮.০৫ শতাংশ। বাজার খরচের চেয়ে আয় কম বাড়ায় মজুরি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যকার নেতিবাচক ঘাটতি দাঁড়ায় ০.২১ শতাংশ, যা আগের মাসের চেয়ে দ্বিগুণ। সাধারণ পরিবারগুলো যখন বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও সেবা কিনতে যাচ্ছে, তখন তাদের বর্ধিত বেতনের চেয়ে অতিরিক্ত দাম মেটাতে গিয়ে মূল পকেটের ওপর চাপ পড়ছে, যা সরাসরি জীবনযাত্রার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
চলমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে।a বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের হার গত বছরের একই সময়ের ২.৩৯ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে মাত্র ১.৮৫ শতাংশে। দুই মাসে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫,৭০৯.৭০ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের চেয়েও কম। বিশেষ করে বৈদেশিক অর্থায়নে পরিচালিত বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে অর্থ ছাড় ও বাস্তবায়নের গতি বেশ কমে গেছে। জিইডি তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে যে প্রকল্পগুলোর প্রশাসনিক প্রস্তুতি, দরপত্র প্রক্রিয়া দ্রুতকরণ এবং ফিল্ড লেভেলে সমন্বিত নজরদারি না বাড়ালে আগামী মাসগুলোতে সরকারি অবকাঠামোগত বিনিয়োগের গতি আরও থমকে যেতে পারে।
অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রে কিছু আশার আলো দেখা গেলেও বহিস্থ বা বৈদেশিক খাতে বেশ কিছু বিপরীতমুখী সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো থাকায় আগস্ট মাসে বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভ কিছুটা বাড়লেও এবং ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি বৃদ্ধি পেলেও দেশীয় পণ্য রপ্তানি আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এছাড়া টাকার বাস্তব কার্যকরী বিনিময় হার শক্তিশালী হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বা প্রাইস কমপেটিটিভনেস কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানো এবং সাধারণ শ্রমিকের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনাই হবে আগামী দিনগুলোতে সামষ্টিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের মূল পরীক্ষা।

