এক সময় দেশের মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল ইকোনো বলপেন। সেই ইকোনো কলমের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জিকিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজ দীর্ঘ নয় বছর লোকসানের পর আবারও মুনাফায় ফিরেছে। পরিচালন ব্যয় কমানো এবং নিজস্ব বাণিজ্যিক ভবন থেকে ভাড়া আয় বাড়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে।
এর আগে প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ ২০১৬ সালে লাভের মুখ দেখেছিল। ওই বছর তাদের মুনাফার পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এরপর টানা নয় বছর লোকসানের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে কোম্পানিটিকে।
কোম্পানির প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি আয় দাঁড়িয়েছে ১২ পয়সা। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য ছিল ১৪৩ টাকা ৬০ পয়সা এবং পরিচালন কার্যক্রম থেকে শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহ ছিল ৫৮ পয়সা।
মুনাফার তথ্য প্রকাশ এবং লভ্যাংশ ঘোষণার পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়ে ৬০৯ টাকা ৩০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। কোম্পানিটির বাজার মূলধনের পরিমাণ প্রায় ৫১০ কোটি টাকা।
জিকিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উজ্জ্বল কুমার সাহা জানান, পুরোনো যন্ত্রপাতির কারণে উৎপাদন কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। এর ফলে পরিচালন ব্যয় কমানো সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, যন্ত্রপাতি অনেক পুরোনো হয়ে যাওয়ায় সর্বশেষ বার্ষিক সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের পর উৎপাদন কার্যক্রম কিছুটা কমানো হয়েছে। এর মাধ্যমে কোম্পানির পরিচালন খরচ নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
কোম্পানিটি আরও একটি বড় সুবিধা পেয়েছে উত্তরা এলাকায় থাকা তাদের বহুতল বাণিজ্যিক ভবন থেকে। ১৪ তলা এই ভবনের ভাড়া থেকে নিয়মিত আয় আসছে, যা মূল ব্যবসার দুর্বল সময়েও প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিকভাবে সহায়তা করেছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকেও আয় করছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে মূল কলম উৎপাদন ব্যবসায় চ্যালেঞ্জ থাকলেও বিকল্প আয়ের উৎস কোম্পানির আর্থিক অবস্থাকে কিছুটা শক্তিশালী করেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ১২ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সুপারিশ করেছে জিকিউ বলপেন। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। আগামী ৩০ নভেম্বর কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হবে এবং ৪ নভেম্বর রেকর্ড তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে মুনাফায় ফেরার পরও প্রতিষ্ঠানটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল কলম উৎপাদন ব্যবসাকে আবার শক্ত অবস্থানে ফিরিয়ে আনা। কারণ গত কয়েক বছরে বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং ভোক্তাদের পছন্দেও পরিবর্তন এসেছে।
জিকিউ বলপেন জানিয়েছে, পুরোনো যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ভারসাম্য, আধুনিকায়ন, পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন ব্যাংক ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে নিজেদের অর্থ ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
উজ্জ্বল কুমার সাহা বলেন, বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদের হার অনেক বেশি, যা প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। তাই অতিরিক্ত ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে নিজস্ব অর্থায়নে আধুনিকায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এতে কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে।
আধুনিকায়ন কার্যক্রম শেষ হলে ইকোনো ব্র্যান্ডকে নতুনভাবে বাজারে পরিচিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে কোম্পানিটির। এক সময় দেশের লেখার সামগ্রীর বাজারে যে জনপ্রিয়তা ছিল, তা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত জিকিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজ এক সময় দেশের কলমের বাজারে বড় পরিবর্তন এনেছিল। ইকোনো ব্র্যান্ডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কয়েক দশক ধরে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছিল। তবে ২০১২ সালের পর থেকে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী নতুন নকশা, বেশি বিনিয়োগ এবং শক্তিশালী বিপণন কৌশল নিয়ে বাজারে প্রবেশ করায় প্রতিষ্ঠানটির প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে কোম্পানিটি স্বীকার করেছে, বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাজারে অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে নতুন যন্ত্রপাতি, ছাঁচ এবং বিপণনে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন।
কোম্পানিটি আরও জানিয়েছে, বিভিন্ন বার্ষিক সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডাররা উদ্বৃত্ত অর্থ নতুন শিল্প খাতে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি জমি, স্থায়ী আমানত এবং বেসরকারি ও তালিকাভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মোট ২৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে।
তবে কোম্পানি স্বীকার করেছে, সব বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় নিশ্চিত নয়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার অথবা ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমানে উত্তরা এলাকার ১৪ তলা বাণিজ্যিক ভবন থেকে পাওয়া ভাড়া আয় প্রতিষ্ঠানটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠেছে। কোম্পানির মতে, মূল ব্যবসায় চ্যালেঞ্জ থাকলেও বিনিয়োগ ও সম্পত্তি থেকে পাওয়া আয় তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সাহায্য করছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেয়ারধারণ তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে রয়েছে ৩৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ শেয়ার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ০ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৬০ দশমিক ৭১ শতাংশ শেয়ার।
১৯৮৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া জিকিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজের পরিশোধিত মূলধন বর্তমানে ৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
এক সময়ের জনপ্রিয় ইকোনো কলমের ব্র্যান্ড আবারও বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে নয় বছর পর মুনাফায় ফেরা প্রতিষ্ঠানটির জন্য নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।

