সরকারের ব্যয় বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিবছর রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কর আদায় বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বকেয়া রাজস্ব আদায়, কর ফাঁকি বন্ধে অভিযান, করের আওতা সম্প্রসারণ, কর নিরীক্ষা, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যক্রম এবং বড় করদাতাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকের মতো নানা পদক্ষেপ নিয়েছে এনবিআর। তবে এসব উদ্যোগ প্রত্যাশিত মাত্রায় রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারেনি।
গত তিন অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য এবং বাস্তব সংগ্রহের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ সরকারের নির্ধারিত উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে এনবিআরের প্রকৃত আদায়ের সক্ষমতার মধ্যে একটি বড় ফারাক রয়ে গেছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রকৃত আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি ছিল ২৭ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্য আরও বাড়িয়ে ৪ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। এতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ওই বছরে আদায় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি থেকে গেছে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা।
যদিও আগের বছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় কিছুটা বেড়েছে, তবুও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ কম ছিল।
এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, সরকারের রাজস্ব প্রত্যাশা যত দ্রুত বাড়ছে, এনবিআরের আদায় সক্ষমতা তত দ্রুত বাড়ছে না।
কেন বারবার লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না?
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো বা মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। দেশের কর ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, সীমিত করদাতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা, অর্থনৈতিক ধীরগতি এবং কর ছাড়ের সংস্কৃতি রাজস্ব আদায়ের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, রাজস্ব সংগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এনবিআরের প্রশাসনিক সক্ষমতার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ধীরগতিও রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তার মতে, কর প্রশাসনকে আধুনিক করতে হবে। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা, করদাতা ও কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগ কমানো এবং রাজস্ব নীতি নির্ধারণ ও আদায় কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আলাদা করার প্রয়োজন রয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগের আদায়ের প্রবণতা বিবেচনায় এনবিআরের নির্ধারিত লক্ষ্য অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবসম্মত নয়।
করের আওতা সীমিত, ছাড়ের পরিমাণ বেশি
বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো সীমিত করের আওতা। দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ ও প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলেও তাদের বড় অংশ কার্যকর কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।
ফলে অল্পসংখ্যক নিয়মিত করদাতার ওপর রাজস্বের বড় চাপ পড়ে।
এনবিআরের বিভিন্ন নীতিমূলক প্রতিবেদনে করের সীমিত ভিত্তি, ব্যাপক কর ছাড় এবং কর ফাঁকিকে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিভিন্ন খাতে কর সুবিধা ও ছাড় দেওয়ার কারণে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বড় অংশকে মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থার আওতায় আনা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
এনবিআরের নিজস্ব প্রতিবেদনে কর ব্যবধান নির্ধারণের দুর্বলতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সম্ভাব্য কত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব এবং বাস্তবে কত আদায় হচ্ছে, সেই পার্থক্য নির্ভুলভাবে পরিমাপ করতে না পারায় প্রয়োজনীয় সংস্কার পরিকল্পনা তৈরি কঠিন হয়ে পড়ছে।
৮২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা আটকে আছে মামলায়
রাজস্ব আদায়ের আরেকটি বড় সমস্যা হলো দীর্ঘদিন ধরে চলা কর সংক্রান্ত মামলা। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, আয়কর, মূল্য সংযোজন কর এবং শুল্ক সংক্রান্ত ২৯ হাজার ৫১৯টি মামলায় ৮২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।
এর মধ্যে আয়কর সংক্রান্ত ৫ হাজার ৫০০ মামলায় আটকে আছে ৩৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। মূল্য সংযোজন কর সংক্রান্ত ১১ হাজার ৬৮৪টি মামলায় আটকে আছে ৩৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। আর শুল্ক সংক্রান্ত ১২ হাজার ৩৩৫টি মামলায় আটকে রয়েছে ৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা।
এসব মামলার বড় একটি অংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এনবিআর জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং বকেয়া রাজস্ব আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে এখনো এসব উদ্যোগ থেকে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে এনবিআর বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, দীর্ঘদিনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা, হিসাব সমন্বয়, প্রয়োজনে ব্যাংক হিসাব স্থগিত এবং সার্টিফিকেট মামলা করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে।
সাবেক এনবিআর সদস্য সৈয়দ আমিনুল করিমের মতে, সফলভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হলে কর কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখাতে হবে। তবে বাস্তবে দুই পক্ষের মধ্যেই সমঝোতার আগ্রহ যথেষ্ট নয় এবং আইনি জটিলতাও বড় বাধা।
টিআইএন বাড়লেও রিটার্ন দাখিলে পিছিয়ে করদাতারা
বাংলাদেশে কর শনাক্তকরণ নম্বরধারীর সংখ্যা বাড়লেও নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়কর আদায় বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা।
২০২৬ সালের জুন শেষে দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ।
তবে ২০২৫-২৬ কর বছরে রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র প্রায় ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার করদাতা। অর্থাৎ মোট টিআইএনধারীর মাত্র প্রায় ৩৮ শতাংশ নিয়মিত রিটার্ন দিয়েছেন।
টিআইএনধারী এবং রিটার্ন দাখিলকারীর মধ্যে এই বড় পার্থক্য কর ব্যবস্থায় আনুগত্য বাড়ানোর চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরছে।
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া মনে করেন, বিদ্যমান আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলে রিটার্ন দাখিলের হার বাড়ানো সম্ভব।
তার মতে, ব্যবসায়িক লাইসেন্স নবায়ন, ব্যাংক ঋণ গ্রহণ এবং আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবার ক্ষেত্রে রিটার্ন জমার প্রমাণ বাধ্যতামূলক করা হলে কর নিয়ম মেনে চলার প্রবণতা বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ নয়, বরং সেই লক্ষ্য অর্জনের মতো কার্যকর কাঠামো তৈরি করা। করের আওতা বাড়ানো, প্রশাসনিক সংস্কার, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দীর্ঘদিনের জটিলতা দূর করতে না পারলে উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা আর বাস্তব আদায়ের মধ্যে ব্যবধান থেকেই যাবে।

