বাংলাদেশে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআইয়ের প্রবাহে দুর্বলতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নতুন বিদেশি মূলধন বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। এর মাধ্যমে টানা দ্বিতীয় প্রান্তিকেও নতুন বিনিয়োগে পতনের ধারা দেখা গেল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে নতুন বিদেশি ইকুইটি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৮১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নতুন বিনিয়োগ কমেছে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
এর আগে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নতুন বিদেশি ইকুইটি বিনিয়োগে বড় ধস দেখা যায়। ওই সময়ে বিনিয়োগ কমেছিল ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ফলে পরপর দুই প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান বা ক্রেডিট রেটিংয়ের অবনমন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা তৈরি করেছে। একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত ক্রেডিট রেটিংকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন।
পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা নতুন প্রকল্পে অর্থায়ন, ব্যবসার পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে উদ্বেগ তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে মোট নিট এফডিআইয়ের হিসাবে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশের মোট নিট বিদেশি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩৪৬ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এটি ছিল ৩০৭ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বছরভিত্তিক হিসাবে মোট এফডিআই বেড়েছে ১২ শতাংশ।
তবে এই প্রবৃদ্ধির মূল কারণ নতুন বিনিয়োগ নয়, বরং দেশে আগে থেকেই থাকা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগ। বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ দেশে রেখে ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহার করলে সেটিকে পুনর্বিনিয়োগ আয় বলা হয়।
এপ্রিল-জুন সময়ে পুনর্বিনিয়োগ আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬৯ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারে। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৬৮ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসায় পুনরায় অর্থ投入 করেছে, কিন্তু নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কমেছে।
এই প্রান্তিকে পুনর্বিনিয়োগ আয়ের মোট প্রবাহ ছিল ৬৬৪ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে অর্থ বেরিয়ে গেছে ৪০৩ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলার। ফলে প্রকৃত পুনর্বিনিয়োগ আয় দাঁড়িয়েছে ২৬০ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলার।
এদিকে এফডিআইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণে বড় ধরনের পতন হয়েছে। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে যেখানে এই খাতে নিট প্রবাহ ছিল ২৬ দশমিক ১৩ মিলিয়ন ডলার, সেখানে এপ্রিল-জুন সময়ে তা নেমে এসেছে মাত্র ৮ দশমিক ৬১ মিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক প্রান্তিকের ব্যবধানে কমেছে ৬৭ দশমিক ০৪ শতাংশ।
একই সময়ে গত বছরের তুলনায় আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ কমেছে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ। ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে যেখানে এই প্রবাহ ছিল ৫৮ দশমিক ০৮ মিলিয়ন ডলার।
বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় ঝুঁকি হিসেবে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছে। ২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে যায় ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম ১০ শতাংশের চেয়ে অনেক কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু বাজারের সম্ভাবনা দেখেন না, তারা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং আর্থিক খাতের সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেন। এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যেতে পারে।
২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং পরিস্থিতিতেও মিশ্র সংকেত রয়েছে। মুডিস বাংলাদেশের বি২ রেটিং বহাল রেখে সেপ্টেম্বর মাসে দৃষ্টিভঙ্গি স্থিতিশীল করেছে। অন্যদিকে এসঅ্যান্ডপি এবং ফিচ বাংলাদেশের বি প্লাস রেটিং বজায় রাখলেও দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক রেখেছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং পুনর্বিনিয়োগ করছে। তবে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থা ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

