দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং ভবিষ্যতে গ্যাস সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কাতারের সঙ্গে নতুন দীর্ঘমেয়াদি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করেছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সৌদি আরবের কাছ থেকেও সহায়তা চেয়েছে সরকার। এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি সরবরাহের নতুন পথ তৈরি এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ অক্টোবর সৌদি আরবে কাতারের জ্বালানি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ বিন শেরিদা আল-কাবির সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম আমিত। বৈঠকে বাংলাদেশের বাড়তে থাকা গ্যাসের চাহিদা, বর্তমান এলএনজি আমদানি ব্যবস্থা এবং নতুন দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য খাতের জ্বালানি চাহিদা পূরণে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি পরিবহনে চাপ তৈরি করেছে।
কাতার দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী দেশ। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ কাতার থেকে গ্যাস আমদানি করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সংকটের অভিজ্ঞতার পর বাংলাদেশ এখন সরবরাহের উৎস ও পরিবহন পথ আরও বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে।
কাতারএনার্জির আন্তর্জাতিক সরবরাহ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানির সুযোগ বাড়ানো যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো, কোনো একটি দেশ বা নির্দিষ্ট একটি পরিবহন পথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে একটি স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
কাতারের পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গেও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছে বাংলাদেশ। সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সহকারী মন্ত্রী নাসের আল-কাহতানির সঙ্গে বৈঠকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সহযোগিতা, এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দুই দেশের মধ্যে একটি কার্যকর সহযোগিতা কাঠামো তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এলএনজি টার্মিনাল উন্নয়ন, নতুন জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণ এবং দেশের স্থল ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। বাড়তে থাকা জ্বালানি চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য অর্জনে সৌদি আরব সহযোগিতা করবে। সৌদি পক্ষও বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এদিকে সৌদি আরবের জ্বালানি ও পানি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এসিডব্লিউএ পাওয়ারের সঙ্গেও বৈঠক করেছে বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সামির জে সারহানের সঙ্গে আলোচনায় দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এসিডব্লিউএ পাওয়ার।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টার মধ্যে বাংলাদেশও সৌরবিদ্যুৎসহ বিকল্প জ্বালানি উৎস সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতের জ্বালানি চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদার তৈরি, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ—সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
রিয়াদে অনুষ্ঠিত ১৭তম আন্তর্জাতিক জ্বালানি ফোরামের সাইডলাইনে এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি এবং সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
কাতার ও সৌদি আরবের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনা বাংলাদেশের জ্বালানি কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

