বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর। চলতি অর্থবছর ২০২৬-২৭ এর প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে দেশের মোট আমদানি ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় একই পরিমাণ পণ্য আমদানি করতেও আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে জ্বালানি পণ্য আমদানির বিপরীতে প্রকৃত পরিশোধিত অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়েছে ৩৮ শতাংশের বেশি।
এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জ্বালানি পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ১০ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১০ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি।
সামগ্রিকভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশের মোট আমদানি ব্যয় হয়েছে ১২ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ।
এদিকে নতুন আমদানি আদেশের পরিমাণও বেড়েছে। জুলাই-আগস্ট সময়ে নতুন ঋণপত্র খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের ১১ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৭ দশমিক ৯১ শতাংশ বেশি।
তবে সব ধরনের আমদানিতে একই ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি। উৎপাদন খাতে ব্যবহৃত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে ০ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ০ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ কম।
একইভাবে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও কিছুটা সংকোচন দেখা গেছে। জুলাই-আগস্ট সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির পরিমাণ কমে হয়েছে ৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ কমেছে ২ দশমিক ১৯ শতাংশ।
অন্যদিকে মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এই খাতে আমদানি ব্যয় ২৯ শতাংশের বেশি বেড়ে ০ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানির এই চিত্র দেশের অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে গতি ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেশি থাকা এবং এর ওঠানামার কারণে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। তার মতে, এই প্রবণতা ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সরকার উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সম্প্রসারণমূলক আর্থিক নীতি গ্রহণ করছে। এর ফলে ভবিষ্যতে আমদানি কার্যক্রম আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়ক মুদ্রানীতি, বিভিন্ন প্রণোদনা কার্যক্রম, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উন্নতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করতে পারে।
তবে আমদানি বৃদ্ধির এই ধারা বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। একদিকে এটি উৎপাদন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে দেশের আমদানি ব্যয় আরও বাড়তে পারে। ফলে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার এবং বৈদেশিক মুদ্রার সঠিক ব্যবস্থাপনা আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।

