দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র মংলা বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ৩৩৫.৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩,৫৯২ কোটি ৯ লাখ টাকা) অর্থায়নের একটি সহজ শর্তের ঋণ চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ ও চীন। গত ১০ অক্টোবর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও চায়না এক্সিম ব্যাংকের মধ্যে এই ঐতিহাসিক নমনীয় ঋণ বা কনসেশনাল লোন চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়। চীনা সরকারের এই বিপুল অর্থায়নে মংলা বন্দরে অত্যাধুনিক গিয়ার সংবলিত দুটি বিশাল কনটেইনার টার্মিনাল, কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড এবং মালপত্র ওঠানামার জন্য বিশেষ কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডির দেওয়া অফিশিয়াল বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে চীনের ঝোঁক অনুযায়ী এই সহজ শর্তের ঋণটি মূলত ২.৪০৪ বিলিয়ন ইউয়ান সমপরিমাণ মেয়াদে নির্ধারিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্ম সচিব আলিয়া মেহের এবং চায়না এক্সিম ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার ফেংজুন তিয়ান নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে এই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। এই মেগা প্রকল্পের প্রাক্কলিত মূল্যের সিংহভাগই চীনের পক্ষ থেকে গভর্নমেন্ট-টু-গভর্নমেন্ট বা জিটুজি মেকানিজমের অধীনে বাংলাদেশকে দেওয়া হচ্ছে।
চলমান বৈশ্বিক অর্থায়নের চড়া সুদের হারের বিপরীতে এই ঋণটিতে বাংলাদেশকে বেশ কিছু নমনীয় সুবিধা দেওয়া হয়েছে। চীনা এক্সিম ব্যাংকের সাথে সম্পাদিত এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশকে বার্ষিক মাত্র ২ শতাংশের সহজ ও নমনীয় সুদে এই অর্থ ফেরত দিতে হবে। মোট ২০ বছর মেয়াদী এই ঋণের জন্য দেওয়া হয়েছে পুরো ৫ বছরের রেয়াতকাল বা গ্রেস পিরিয়ড, অর্থাৎ প্রথম ৫ বছর বাংলাদেশকে কোনো আসল অর্থ ফেরত দিতে হবে না। বিশ্ববাজারে ডলার সংকটের এই সময়ে এ ধরনের নমনীয় সুদের আন্তর্জাতিক ঋণ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে নতুন এই মেগা প্রকল্পে বন্দরের পণ্য খালাস ও ডেলিভারির ক্ষমতা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্পের মূল কাঠামোর মধ্যে রয়েছে দুটি সুবিশাল ডিজিটাল কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, যেখানে বিশাল আকৃতির কনটেইনারবাহী জাহাজ অনায়াসে ভিড়তে পারবে। এছাড়া বন্দরের অভ্যন্তরে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও লজিস্টিক সার্ভিস দ্রুত করার লক্ষ্যে সুবিশাল কনটেইনার ইয়ার্ড, ডেডিকেটেড ডেলিভারি এরিয়া এবং আধুনিক হেভি ইকুইপমেন্ট সংবলিত কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড গড়ে তোলা হবে, যা সরাসরি দক্ষিণাঞ্চলের সরবরাহ শৃঙ্খলকে সমৃদ্ধ করবে।
বাণিজ্যিক বিশ্লেষকদের মতে, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকেই ঢাকার কাছাকাছি সমুদ্রবন্দর হিসেবে মংলা বন্দরের গুরুত্ব দ্বিগুণ বেড়েছে। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আধুনিক টার্মিনালের অভাবে খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলের এই বন্দরটি সম্পূর্ণ ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারছিল না। এই চীনা অর্থায়নের বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে ভারত, নেপাল ও ভুটানের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোও ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য মংলা বন্দর ব্যবহারের সুবিধা আরও বেশি গ্রহণ করতে পারবে। সামগ্রিকভাবে এটি একদিকে যেমন বন্দর কেন্দ্রিক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, অন্যদিকে ব্লু ইকোনমি বা সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার করবে।

