জ্বালানি তেল ও শিল্পের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে বাংলাদেশে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বরে আমদানির জন্য ৮১০ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে, যা গত ৫৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং আমদানির পরিমাণে সামান্য প্রবৃদ্ধি এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ৬৬২ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। তবে সেপ্টেম্বরে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ ছিল ৬৩৮ কোটি ডলার।
ব্যাংকাররা বলছেন, এলসি খোলার এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় একই পরিমাণ জ্বালানি আমদানিতে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। পাশাপাশি আমদানির পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি।
শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও ব্যয় বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জিঙ্ক আমদানির দাম প্রতি টনে ৩ হাজার ২০০ ডলার থেকে বেড়ে ৪ হাজার ২০০ ডলারে পৌঁছেছে। ফ্ল্যাট স্টিলের দাম ৫০০ ডলার থেকে বেড়ে ৫৭৫ ডলার এবং বিটুমিনের দাম ৪৫০ ডলার থেকে বেড়ে ৬৫০ ডলার হয়েছে।
প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান ও রশিদ বলেন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে জ্বালানির উচ্চমূল্য বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে কাঁচামাল আমদানি কিছুটা বাড়ার অর্থ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে গতি ফিরতে পারে। তাঁর মতে, এই পুনরুদ্ধার ধীরগতির হলেও ভবিষ্যতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম কিছুটা সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, কৃষি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সার আমদানির ব্যয়ও চাপ বাড়িয়েছে। সাধারণত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে তুলনামূলক বেশি পরিমাণ সার আমদানি করা হয়। ব্যাংকসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, গত মাসে ২০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের সার আমদানি হয়েছে। একই পরিমাণ সার আমদানিতে আগে তুলনামূলক কম অর্থ ব্যয় হতো।
অন্যদিকে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে দেশের পণ্য আমদানি এক বছরের ব্যবধানে ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এ সময়ে মোট আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলার। একই সময়ে আমদানি ব্যয় রপ্তানি আয়কে ছাড়িয়ে যাওয়ায় পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৩৮২ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
তবে এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোতে বড় ধরনের ডলারসংকট নেই বলে জানিয়েছেন বেসরকারি খাতের একটি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্য, আমদানি পরিশোধের চাহিদা মেটাতে ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত ডলার তারল্য রয়েছে। ফলে এলসি খোলায় বড় কোনো বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে না ব্যবসায়ীদের।
আমদানি এলসি খোলার পরিমাণ বৃদ্ধি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে কিছুটা গতি ফেরার ইঙ্গিত দিলেও এর পুরোটা অর্থনীতির সম্প্রসারণ নির্দেশ করে না। কারণ, আমদানি পণ্যের আন্তর্জাতিক দাম বাড়লে পণ্যের পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকলেও মোট আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে আমদানি ব্যয়ের এই প্রবৃদ্ধি প্রকৃত আমদানি বৃদ্ধি, নাকি মূলত মূল্যবৃদ্ধির ফল—তা বুঝতে পণ্যের পরিমাণ ও মূল্য পরিবর্তন আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

