বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে অপ্রচলিত রপ্তানি বাজারগুলো। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রচলিত বাজারের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার যে চেষ্টা চলছে, তার ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে। বিশেষ করে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাস, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৯.৪০ শতাংশ বেড়ে ১৮১ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে দেশের সামগ্রিক তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৬.১০ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক খাতের তুলনায় অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বাংলাদেশ মোট ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৯৯৭ কোটি ডলার।
এই পরিসংখ্যান শুধু রপ্তানি আয়ের বৃদ্ধিই নির্দেশ করে না; বরং বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে বাজার বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টা যে ধীরে ধীরে ফল দিতে শুরু করেছে, তারও ইঙ্গিত দেয়। যদিও প্রচলিত বাজারগুলো এখনো রপ্তানির প্রধান গন্তব্য, নতুন বাজারে তুলনামূলক দ্রুত প্রবৃদ্ধি ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশ আসছে নতুন বাজার থেকে
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় অংশ এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার বাজারনির্ভর। তবে এর বাইরে এশিয়া, ওশেনিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলোও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশ এসেছে অপ্রচলিত বাজার থেকে। এ বাজারগুলোতে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮১ কোটি ডলার।
বিশেষভাবে লক্ষণীয়, আগের অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি কমলেও চলতি অর্থবছরের আগস্ট থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। সেপ্টেম্বরেও সেই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকে।
অবশ্য তিন মাসের প্রবৃদ্ধি দিয়েই পুরো অর্থবছরের ফলাফল নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এই গতি ধরে রাখতে হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা, পণ্যের মান, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রচলিত বাজারেও রপ্তানি বেড়েছে
অপ্রচলিত বাজারে তুলনামূলক বেশি প্রবৃদ্ধি হলেও বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোতে তৈরি পোশাকের চাহিদা ইতিবাচক রয়েছে।
জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রপ্তানি ৩.৩৩ শতাংশ বেড়ে ৪৯০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে ১০.৪০ শতাংশ, যার আর্থিক পরিমাণ ২২২ কোটি ডলার।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের বাজারে ৫.৯৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে রপ্তানি আয় হয়েছে ১২৯ কোটি ডলার। কানাডায় ৩.৮৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৯৬ লাখ ৫০ হাজার ডলারে।
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, প্রচলিত বাজারগুলোর গুরুত্ব এখনো অপরিসীম। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১০.৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পোশাক খাতের জন্য ইতিবাচক। তবে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি কমাতে শুধু কয়েকটি বড় বাজারের ওপর নির্ভর না করে নতুন গন্তব্যে রপ্তানি সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে।
কারণ কোনো বড় বাজারে অর্থনৈতিক মন্দা, শুল্কনীতি পরিবর্তন কিংবা ভোক্তা চাহিদা কমে গেলে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে পড়তে পারে। বাজারের সংখ্যা বাড়ানো গেলে এ ধরনের ঝুঁকি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব।
পাঁচটি দেশেই অপ্রচলিত বাজারের বড় সম্ভাবনা
বাংলাদেশের অপ্রচলিত পোশাক রপ্তানি বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি দেশ হলো জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়া।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের সংকলিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এই পাঁচ দেশে মোট ১০৩ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এটি অপ্রচলিত বাজারে মোট রপ্তানির ৫৬.৫৮ শতাংশ।
পাঁচটি দেশের মধ্যে চারটিতে রপ্তানি বেড়েছে। একমাত্র ভারতের বাজারে রপ্তানি কমেছে।
জাপান: অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোশাক রপ্তানি গন্তব্য। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশটিতে রপ্তানি ২.৬১ শতাংশ বেড়ে ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। জাপানের বাজারে পণ্যের মান, নকশা ও ক্রেতার পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে এগোতে পারলে আরও বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া: দ্বিতীয় বৃহত্তম অপ্রচলিত বাজার অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি ১.০২ শতাংশ বেড়ে ২০ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্রবৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম হলেও বাজারটির আকার এবং ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারত: প্রতিবেশী দেশ ভারতে রপ্তানি ৫.৩৭ শতাংশ কমে ২০ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ডলারে নেমেছে। গত এক বছরে দুই দেশের বাণিজ্যসংক্রান্ত টানাপোড়েনের মধ্যে বন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ হওয়ায় পোশাক রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে ভারতের বাজার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তুরস্ক: সবচেয়ে বড় চমক এসেছে তুরস্কের বাজার থেকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১২৩.১৪ শতাংশ বেড়ে ১৪ কোটি ৬৬ লাখ ৩০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ছাড়াই এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হওয়ায় বাজারটির সম্ভাবনা নতুনভাবে সামনে এসেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া: দক্ষিণ কোরিয়ায় পোশাক রপ্তানি ৮.৮১ শতাংশ বেড়ে ১২ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বমূলক উদ্যোগ ভবিষ্যতে বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে।
এই পাঁচ দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাপান এখনো সবচেয়ে বড় বাজার হলেও প্রবৃদ্ধির বিচারে তুরস্ক অনেক এগিয়ে। অন্যদিকে ভারতের বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা।
তুরস্কের বাজারে বড় উল্লম্ফনের পেছনে কী সম্ভাবনা?
অপ্রচলিত বাজারের সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধিতে তুরস্ক বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। দেশটিতে রপ্তানি ১২৩.১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারকদের জন্য নতুন সুযোগের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধিকে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে একটি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। তুলনামূলক ছোট ভিত্তি থেকে রপ্তানি বাড়লে প্রবৃদ্ধির হার অনেক বেশি দেখা যেতে পারে। তাই শুধু প্রবৃদ্ধির শতাংশ নয়, বাজারের মোট আকার এবং ধারাবাহিক চাহিদাও বিবেচনায় নিতে হবে।
তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশ এ বিষয়ে তুরস্ককে উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানিয়েছে, যদিও আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনো শুরু হয়নি।
এ অবস্থায় কোনো চুক্তি ছাড়াই রপ্তানির উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে বাজারটি আরও গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। সেখানে ক্রেতাদের চাহিদা, পোশাকের ধরন, মূল্য ও প্রতিযোগিতার বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া গেলে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
জাপানের সঙ্গে চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
অপ্রচলিত বাজার সম্প্রসারণে বাংলাদেশের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলো জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি।
২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জাপানের সঙ্গে প্রথম অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির আওতায় তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে চুক্তিটি এখনো অনুসমর্থনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে জাপান স্বল্পোন্নত দেশের জন্য বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
ফলে নতুন চুক্তিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধার নিশ্চয়তা দেওয়ার সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য এটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ রপ্তানিকারকদের বড় বিনিয়োগ, নতুন ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অনেকাংশে ভবিষ্যতের বাজার সুবিধার ওপর নির্ভর করে।
শুল্কনীতির বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা থাকলে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নেওয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে। তবে সুবিধা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হলে চুক্তির শর্ত, উৎপত্তিবিধি এবং ক্রেতাদের মানসংক্রান্ত চাহিদা পূরণের সক্ষমতা থাকতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তিতেও নতুন সুযোগ
জাপানের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ।
২০২৬ সালের আগস্টের শুরুতে দুই দেশ একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর আওতায় বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে দক্ষিণ কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ পণ্য একই ধরনের সুবিধার আওতায় আসবে।
চুক্তিটি অনুসমর্থনের পর কার্যকর হলে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৪৬ কোটি ৪৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার, যা অপ্রচলিত বাজারে মোট রপ্তানির প্রায় ২৬ শতাংশ।
অর্থাৎ শুধু এই দুই দেশই বাংলাদেশের নতুন বাজারভিত্তিক রপ্তানি আয়ের এক-চতুর্থাংশের বেশি অবদান রাখছে।
তাই জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক আরও গভীর করা গেলে অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে।
আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটেও সুযোগ খুঁজছে বাংলাদেশ
নতুন বাজার সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশ আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বা আরসিইপি জোটে যোগদানের উদ্যোগও এগিয়ে নিচ্ছে।
২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আরসিইপির মন্ত্রীরা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করার জন্য একটি কার্যদল গঠনের অনুমোদন দেন।
এটি বাংলাদেশের বাণিজ্য কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে কার্যদল গঠনের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জোটটির সদস্য হয়ে গেছে বা সব বাণিজ্য সুবিধা কার্যকর হয়েছে।
বাংলাদেশের শীর্ষ পাঁচ অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া এই জোটের সদস্য। এই তিন দেশ অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৩৭ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
এ ছাড়া চীন ও নিউজিল্যান্ডও জোটটির সদস্য।
এ ধরনের আঞ্চলিক বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়লে বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজারে প্রবেশ, বাণিজ্যিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাস্তবে কতটুকু সুবিধা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে আলোচনার ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য শর্তের ওপর।
ভারতের বাজারে রপ্তানি কমা কেন উদ্বেগের?
প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় পোশাক রপ্তানি বাজার। দুই দেশের ভৌগোলিক নৈকট্য, স্থলপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ এবং বিস্তৃত ভোক্তা বাজারের কারণে এখানে বাণিজ্য সম্প্রসারণের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৫.৩৭ শতাংশ কমেছে।
গত এক বছরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন এবং বন্দরসংক্রান্ত বিধিনিষেধ এই পরিস্থিতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা শুধু রপ্তানিকারকদের জন্যই সমস্যা তৈরি করে না। পণ্য পরিবহনে বিলম্ব, অতিরিক্ত ব্যয় এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের বক্তব্যেও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে এসব সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
ভারতের বাজারে রপ্তানি পুনরুদ্ধারের জন্য তাই শুধু ব্যবসায়ীদের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নাও হতে পারে। সরকারি পর্যায়ে কার্যকর আলোচনা, বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা নিরসন এবং পণ্য পরিবহন সহজ করার উদ্যোগও প্রয়োজন।
হাজার কোটি ডলারের লক্ষ্যে কী করতে হবে?
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন, অপ্রচলিত বাজারগুলোতে নিয়মিত আন্তর্জাতিক মেলা ও প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ এবং কার্যকর বিপণন কার্যক্রম রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
তার মতে, এসব বাজারে বাংলাদেশের বর্তমান রপ্তানি এখনো তুলনামূলক কম হলেও জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও চীনের মতো দেশে বড় সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে ভারত ভৌগোলিকভাবে কাছে হওয়ায় এবং জাপান ও অস্ট্রেলিয়া বড় বাজার হওয়ায় এগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
সঠিক কৌশল অনুসরণ করা গেলে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি ১ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
তবে এটি বর্তমান রপ্তানি অর্জন নয়, বরং সম্ভাবনাভিত্তিক একটি লক্ষ্য।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি হয়েছে ১৮১ কোটি ডলার। এই গতি চার প্রান্তিকে অপরিবর্তিত থাকলে বছরে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৭২৪ কোটি ডলার। সে হিসাবে ১ হাজার কোটি ডলারের লক্ষ্য অর্জনে আরও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।
তাই শুধু বিদ্যমান বাজারে রপ্তানি বাড়ালেই চলবে না; নতুন ক্রেতা তৈরি, উন্নত মানের পোশাক উৎপাদন এবং উচ্চমূল্যের পণ্যে প্রবেশের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
শুধু কম দামের পোশাক নয়, গুরুত্ব দিতে হবে নকশা ও উদ্ভাবনে
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে তৈরি পোশাক উৎপাদনের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। তবে সব বাজারের ক্রেতাদের চাহিদা এক নয়।
বিশেষ করে জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বাজারে পোশাকের নকশা, ফ্যাশনের পরিবর্তন এবং ভোক্তাদের পছন্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মহিউদ্দিন রুবেলও এসব বাজারের ফ্যাশন প্রবণতার সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাক খাতকে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
তার পর্যবেক্ষণে গবেষণা ও উন্নয়ন, নিজস্ব নকশাকেন্দ্র, উচ্চমূল্যের পোশাক, উদ্ভাবন এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর নীতিগত সহায়তারও প্রয়োজন রয়েছে।
বাস্তবতা হলো, নতুন বাজারে প্রবেশের পাশাপাশি সেখানে দীর্ঘদিন অবস্থান ধরে রাখাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
যেসব দেশের ক্রেতারা নকশা, গুণগত মান এবং নতুন ধরনের পোশাকের প্রতি বেশি সংবেদনশীল, সেখানে শুধু কম উৎপাদন ব্যয় দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হতে পারে।
এ জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের প্রবণতা নিয়ে নিয়মিত গবেষণা, স্থানীয় কারখানাগুলোর নকশা উন্নয়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন ধরনের পোশাক তৈরিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বিশেষ করে উচ্চমূল্যের পণ্যের অংশ বাড়ানো গেলে একই পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করেও তুলনামূলক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গত অর্থবছরের পতনের পর নতুন আশার সঞ্চার
অপ্রচলিত বাজারে চলতি অর্থবছরের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আগের অর্থবছরের ফলাফলের কারণে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব বাজারে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি ৪.২৫ শতাংশ কমে ৬১৬ কোটি ডলারে নেমেছিল। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ৬৪৪ কোটি ডলার।
অর্থাৎ আগের অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়েছিল।
সে প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৯.৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তন।
তবে পুরো অর্থবছর শেষে এই পুনরুদ্ধার কতটা শক্তিশালী হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। প্রথম তিন মাসের প্রবণতা বাকি নয় মাসেও বজায় থাকে কি না, সেটিই হবে বড় বিষয়।
বিশেষ করে তুরস্কের দ্রুত প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তির বাস্তব সুবিধা কাজে লাগানো এবং ভারতের বাজারে বাধা কমানোর ওপর ভবিষ্যতের অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভর করতে পারে।
নতুন বাজারে টেকসই অবস্থান গড়াই বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অবস্থান ধরে রাখতে বাজার বৈচিত্র্য এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে শক্তিশালী উপস্থিতির পাশাপাশি এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলে নতুন ক্রেতা তৈরি করা গেলে রপ্তানি খাতের ঝুঁকি তুলনামূলক কমতে পারে।
তবে নতুন বাজার সম্প্রসারণের জন্য কয়েকটি বিষয়ে সমন্বিত অগ্রগতি প্রয়োজন। প্রথমত, কোন দেশে কী ধরনের পোশাকের চাহিদা বেশি, তা নিয়মিত বিশ্লেষণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের মাধ্যমে নতুন ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ জোরদার করা দরকার।
তৃতীয়ত, পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি নকশা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা কাজে লাগাতে ব্যবসায়ীদের প্রস্তুত করতে হবে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহন, সরবরাহের সময় এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত জটিলতা কমানোর বিষয়েও নজর দিতে হবে।
অপ্রচলিত বাজারে বর্তমান প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপান্তরিত করতে হলে পরিকল্পিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো বিদ্যমান ক্রেতাদের পাশাপাশি নতুন বাজারে একটি নির্ভরযোগ্য, মানসম্মত ও প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অপ্রচলিত বাজারে ৯.৪০ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তুরস্কের বাজারে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের অগ্রগতি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে ভারতের বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়া এবং গত অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারের সামগ্রিক নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি মনে করিয়ে দিচ্ছে, সাফল্যের পথ এখনো পুরোপুরি মসৃণ নয়।
আগামী দিনে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সাফল্য শুধু কত বেশি পোশাক উৎপাদন করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং কোন বাজারে, কী ধরনের পণ্য এবং কতটা মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে রপ্তানি করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
পরিকল্পিত বাজার সম্প্রসারণ, পণ্যের বৈচিত্র্য, গবেষণা, উন্নত নকশা এবং কার্যকর বাণিজ্য কূটনীতির সমন্বয় ঘটাতে পারলে অপ্রচলিত বাজারগুলো বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

