চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে ধীর গতিতে এগোতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে মাত্র ৩.২ শতাংশ। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলেও আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি কমছে, আর জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, একসঙ্গে দুটি চাপই সামনে এসেছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি এমন সময়ে প্রকাশ পেল, যখন ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠক চলছে। সেই বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সংস্কার কর্মসূচি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থায়ন পাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সর্বশেষ এত কম প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে। তখন জিডিপি বেড়েছিল ৩.১১ শতাংশ। এমনকি কোভিড মহামারির বছরেও, অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরে, প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৪৫ শতাংশ। সেই হিসাবে নতুন পূর্বাভাস সত্য হলে এটি হবে ৩৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অর্থবছর। মহামারির ধাক্কার চেয়েও এই পূর্বাভাস নিচে, যা পরিস্থিতির গভীরতা বোঝাতে যথেষ্ট।
আইএমএফ গত কয়েক মাসে বারবার পূর্বাভাস কমিয়েছে। এপ্রিলে সংস্থাটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৪.৩ শতাংশ হবে বলে জানিয়েছিল। জুলাইয়ে তা কমিয়ে করা হয় ৩.৫ শতাংশ। এবার আরও কমে দাঁড়াল ৩.২ শতাংশে। এপ্রিলের তুলনায় কমেছে ১.১০ শতাংশীয় পয়েন্ট। পূর্বাভাসের এই ধারাবাহিক নিম্নমুখী সংশোধন ইঙ্গিত দেয়, অর্থনীতির সংকট আগের ধারণার চেয়ে গভীর হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসে পরিবর্তন আরও নাটকীয়। এপ্রিলে আইএমএফ বলেছিল, চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি হবে ৬ শতাংশ। নতুন পূর্বাভাসে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১০.৯ শতাংশে উঠেছে। এর অর্থ, সাধারণ মানুষের আয়ের তুলনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার খরচ আরও দ্রুত বাড়বে। প্রবৃদ্ধি কমে গেলে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সংকুচিত হয়। আবার একই সময়ে দাম বাড়লে ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। দুই চাপ একসঙ্গে এলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে।
অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তুলনায়ও আইএমএফের পূর্বাভাস বেশি হতাশাজনক। বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাস ৪ শতাংশ। অর্থাৎ আইএমএফের হিসাব সবচেয়ে নিচে। তবে তিনটি সংস্থার পূর্বাভাসই একটি বিষয়ে একমত। প্রবৃদ্ধি আগের বছরগুলোর তুলনায় দুর্বল থাকবে।
আইএমএফের হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৬ শতাংশ। তার আগের অর্থবছরে ছিল ৩.৫ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, টানা কয়েক বছর ধরেই প্রবৃদ্ধি নিম্নগতিতে আছে। নতুন পূর্বাভাসে সেই প্রবণতা আরও এক ধাপ নিচে নামল।
আঞ্চলিক তুলনাতেও বাংলাদেশ পিছিয়ে। একই অর্থবছরে আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী ভারতের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ শতাংশ এবং ভুটানের ৬.৯ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি অর্ধেকেরও কম। এক সময় দ্রুত বেড়ে ওঠা অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের যে সুনাম ছিল, তা ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধি কমার নির্দিষ্ট কারণ আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি। তবে প্রবৃদ্ধি হ্রাস ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই যুগল চিত্র দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর চাপের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। সরকারের জন্য এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনার দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ সামলানো সহজ হবে না।
ব্যাংককের বৈঠকে সংস্কার কর্মসূচি ও উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। নতুন এই পূর্বাভাস সেই আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। নীতিনির্ধারকেরা কী পদক্ষেপ নেন, তার ওপরই নির্ভর করবে পূর্বাভাসের এই নেতিবাচক চিত্র শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তব হয়ে ওঠে।

