আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই) গবেষণায় দেখা গেছে,দেশের কৃষকের মাত্র ২ শতাংশের নিজস্ব কোনো যন্ত্র রয়েছে। বাকি ৯৮ শতাংশই ভাড়ায় কৃষি যন্ত্র ব্যবহার করেন।ফলে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে যান্ত্রিকীকরণের প্রয়োজনীয়তা বাড়লেও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা কৃষকদের জন্য বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
আইএফপিআরআই প্রকাশ করে, প্রতি ১০০ জন কৃষকের মধ্যে ৯৮ জন ট্রাক্টর এবং ৯৫ জন পাওয়ার টিলার ভাড়া করে ব্যবহার করেন। নিজস্ব থ্রেশার মেশিন রয়েছে মাত্র ৬ শতাংশ কৃষকের। সেচের জন্য নিজস্ব টিউবওয়েল ও পাওয়ার পাম্প রয়েছে যথাক্রমে ১৪ ও ১৬ শতাংশ কৃষকের। গবেষণায় কৃষি যন্ত্র ভাড়া দেওয়ার বাজারে বছরে প্রায় ৩১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার আয়ের তথ্যও উঠে এসেছে।
সম্প্রতি রাজধানীর বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) ‘বাংলাদেশের খাদ্য ব্যবস্থায় অর্থায়ন: প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ ও নীতি সংলাপ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। আইএফপিআরআই ও বিআইডিএস যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে আইএফপিআরআইয়ের রিসার্চ ফেলো ড. এম মেহরাব বখতিয়ার কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং এ খাতে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা নিয়ে গবেষণা উপস্থাপন করেন।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফসল কাটার কাজে কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহারও দ্রুত বেড়েছে। ২০১৮ সালে এ যন্ত্রের মাধ্যমে ফসল কাটার হার ছিল ১ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ২০ শতাংশে পৌঁছায়। তবে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও কৃষকের নিজস্ব মালিকানা বাড়ানো এবং যন্ত্র কেনার জন্য সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে। একটি কৃষি যন্ত্র কিনতে ধরন ও সক্ষমতাভেদে ১ লাখ থেকে ৩২ লাখ টাকা পর্যন্ত মূলধন প্রয়োজন হতে পারে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে এককভাবে এত অর্থের সংস্থান করা কঠিন।
ব্যাংকঋণের সীমাবদ্ধতা কৃষি যন্ত্রের মালিকানা সম্প্রসারণে অন্যতম বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। গবেষণা উপস্থাপনায় বলা হয়, হারভেস্টার কেনার অর্থের মাত্র ৫ শতাংশ এসেছে ব্যাংকঋণ থেকে। বিপরীতে, ৩২ শতাংশ অর্থ এসেছে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে, ২৭ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণদাতা বা এনজিও থেকে এবং ৮ শতাংশ মহাজনের কাছ থেকে। অর্থাৎ কৃষি যন্ত্র কেনার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিবর্তে ব্যক্তিগত ধার ও বিকল্প ঋণ উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।
এর পেছনে ঋণনীতির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। কৃষি ঋণনীতিমালায় অন্যের জমিতে ভাড়ায় কৃষিযন্ত্র পরিচালনার উদ্দেশ্যে যন্ত্র কেনার বিষয়টি কৃষিঋণের আওতায় না থাকায় যন্ত্রসেবা প্রদানকারীরা ব্যাংকঋণ পেতে সমস্যায় পড়েন। অথচ এসব যন্ত্রের বড় অংশই অন্য কৃষকের জমিতে সেবা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
কৃষি অর্থায়নের সংকট শুধু যন্ত্র কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত আরেকটি গবেষণায় বলা হয়, ২০০০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে গ্রামীণ ঋণে কৃষির অংশ ২৫ শতাংশ থেকে কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে দরিদ্র ঋণগ্রহীতার হার ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকের খামার পরিচালনার ঋণের বড় অংশ সার, বীজ ও জমি লিজ নেওয়ার পেছনে ব্যয় হয়। ফলে উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা কিংবা কৃষি কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য বাড়তি অর্থের সুযোগ সীমিত থাকে।
কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ার আরেকটি কারণ শ্রমিকসংকট। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি সচিব মো. সেলিম খান বলেন, দেশের ৪১ শতাংশের বেশি শ্রমশক্তি কৃষির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কৃষিকাজে মানুষের আগ্রহ কমছে। বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে এবং বেশি মজুরি দিয়েও শ্রমিক সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন কৃষি সচিব। তিনি জানান, দক্ষিণাঞ্চলে সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণে চুক্তিভিত্তিক কৃষি কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় সরকার কৃষককে সার ও বীজ সরবরাহ করবে এবং অংশীদার প্রতিষ্ঠান উৎপাদিত ফসল কেনার নিশ্চয়তা দেবে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, এসব ফসল দেশে তেল উৎপাদনে ব্যবহার করা হবে, রপ্তানি করা যাবে না বলে তিনি জানান।
বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে শুধু ভর্তুকিতে যন্ত্র সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়। যন্ত্রসেবা প্রদানকারীদের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ, ঋণনীতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, যন্ত্রের সঠিক বণ্টন এবং রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনায় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি। আইএফপিআরআইয়ের আগের গবেষণাগুলোতেও কৃষি যান্ত্রিকীকরণে অর্থায়নের বাধা, ভর্তুকির কার্যকারিতা এবং যন্ত্র বিতরণে আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
কৃষি যন্ত্রের ভাড়াভিত্তিক বাজার কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এ বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ব্যাংকঋণের সীমিত সুযোগ কৃষি উদ্যোক্তাদের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কৃষিকে শ্রমনির্ভর ব্যবস্থা থেকে আরও উৎপাদনশীল ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হলে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি যন্ত্র কেনা ও কৃষি উদ্যোগ সম্প্রসারণে সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

