দীর্ঘদিন ধরে কম উৎপাদন খরচ, বড় শ্রমশক্তি এবং প্রতিযোগিতামূলক দামের ওপর নির্ভর করে বিশ্বের অন্যতম বড় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু বৈশ্বিক পোশাক বাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতায় সেই পুরোনো ব্যবসায়িক মডেল এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা তাদের পণ্য সংগ্রহের উৎস বা সরবরাহকারী দেশ বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে দেশে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাণিজ্য সুবিধা হারানোর সম্ভাবনা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতদিন বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের বড় শক্তি ছিল কম দামে বড় পরিমাণে উৎপাদন করার সক্ষমতা। কিন্তু এখন শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহ করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তা উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনের দিকে এগোলেও এই পরিবর্তনের গতি এখনো ধীর।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সম্প্রতি বলেন, দীর্ঘদিন বাংলাদেশ থেকে পোশাক সংগ্রহ করা কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতা কৌশলগত কারণে তাদের কিছু কার্যাদেশ অন্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছে।
তার মতে, শুধু উৎপাদন সক্ষমতা নয়, বর্তমানে ক্রেতারা সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, দ্রুত পণ্য সরবরাহ এবং ঝুঁকি কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতে আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট। পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় অনেক কারখানা সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে সমস্যায় পড়ছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থার ওপরও প্রভাব পড়ছে।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং লোহিত সাগরে হুথি হামলার কারণে বৈশ্বিক নৌপথেও পরিবর্তন এসেছে। এশিয়া থেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে পণ্য পরিবহনে অনেক জাহাজ এখন সুয়েজ খালের পরিবর্তে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যাচ্ছে। ফলে পরিবহন সময় ও খরচ দুটোই বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের কাছাকাছি দেশগুলো, যেমন মিসর ও ইথিওপিয়া, ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। কারণ এসব দেশ থেকে পণ্য পরিবহনে সময় ও ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
কম খরচের সুবিধার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হচ্ছে
১৯৮০ সালের শুরু থেকে বাংলাদেশ বিপুল শ্রমশক্তি এবং কম উৎপাদন ব্যয়ের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিশ্ব পোশাক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করে।
এই মডেল বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং দেশটি বিশ্বের শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারকদের একটি হয়ে ওঠে।
তবে বর্তমানে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের দাম বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। ফলে কম দামে উৎপাদনের পুরোনো সুবিধা ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য এর একটি উদাহরণ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশি পোশাকের গড় মূল্য ছিল প্রতি কেজি ১৩ দশমিক ৮০ ইউরো। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই মূল্য ছিল ১৫ দশমিক ০৭ ইউরো।
অন্যদিকে একই সময়ে ভিয়েতনামের পোশাকের গড় মূল্য বেড়ে হয়েছে প্রতি কেজি ২৯ ইউরো, যা বাংলাদেশের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
এই পার্থক্য দেখায় যে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো অনেকাংশে অপেক্ষাকৃত কম মূল্য সংযোজনকারী পণ্যের ওপর নির্ভরশীল।
যদিও অনেক বাংলাদেশি কারখানা এখন উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে যাচ্ছে, তবে এই পরিবর্তন ধীরে এগোচ্ছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে মোট উৎপাদনের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উচ্চমূল্যের পোশাক, যা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
এলডিসি উত্তরণের পর নতুন চাপ
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর তৈরি পোশাক খাতের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধার কারণে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে এসব সুবিধা কমে গেলে রপ্তানিকারকদের নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
বাংলাদেশ যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারে অথবা নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে না পারে, তাহলে বড় বাজারে শুল্ক বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ ইউরোপীয় বাজারে যায়, যার বার্ষিক মূল্য ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
শুল্ক সুবিধা কমে গেলে বাংলাদেশের পোশাক পণ্যের ওপর গড়ে প্রায় ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে। এতে কম দামের ওপর নির্ভরশীল প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা আরও কমে যেতে পারে।
শ্রম সংকট ও নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ
গার্মেন্টস খাতের সমস্যা শুধু উৎপাদন ব্যয় ও বাণিজ্য নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় পাঁচ দশকের বিকাশের পর এই শিল্পের উদ্যোক্তা কাঠামোতেও পরিবর্তন আসছে।
প্রথম প্রজন্মের অনেক উদ্যোক্তা এখন বয়সের কারণে পিছিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের অনেক উত্তরসূরি পুরোনো ব্যবসায়িক মডেল ধরে রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন।
কিছু পুরোনো কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগের গতিও কিছুটা ধীর হয়েছে।
শ্রমশক্তির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমছে।
১৯৮০ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের প্রায় ৮০ শতাংশ ছিলেন নারী। ২০০৫ সালে এই হার কমে ৭০ শতাংশে আসে এবং ২০২১ ও ২০২৩ সালে বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী তা প্রায় ৫৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কঠোর কাজের চাপ এবং তুলনামূলক কম মজুরির কারণে তরুণ প্রজন্মের অনেকেই গার্মেন্টসে কাজের পরিবর্তে অটোরিকশা চালানো বা ছোট ব্যবসার মতো পেশাকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করছে।
এর পাশাপাশি কারখানায় অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। উৎপাদন খরচ কমাতে উদ্যোক্তারা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করছেন, যা ভবিষ্যতে শ্রমের চাহিদায় পরিবর্তন আনতে পারে।
অন্যদিকে কিছু নারী শ্রমিক বেশি বেতন ও উন্নত সুযোগের আশায় জর্ডানের মতো দেশেও যাচ্ছেন।
তবে বাংলাদেশের পোশাক খাতের একটি বড় অর্জন হলো কর্মপরিবেশের উন্নতি। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি শক্তিশালী হয়েছে।
কিন্তু শুধু নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ উন্নত করলেই ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে না। উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাজার সুবিধার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে পথ কী?
বাংলাদেশের পোশাক খাতের এখনো বড় শক্তি হলো বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা, অভিজ্ঞ শ্রমশক্তি এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।
তবে ভবিষ্যতে শুধু কম দামের ওপর নির্ভর না করে পণ্যের মান, নকশা, প্রযুক্তি এবং মূল্য সংযোজন বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে নতুন বাজার খোঁজাও জরুরি। ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর মাধ্যমে পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানো যেতে পারে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এলডিসি উত্তরণের পর বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির আলোচনা রয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে ক্রেতারা সরবরাহ ব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় করছে। তবে বাংলাদেশও এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তিনি জানান, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব চুক্তি হলে বাংলাদেশি পণ্য শূন্য শুল্ক সুবিধা পেতে পারে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাকের ওপর থাকা ১০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়েও আলোচনা চালানোর দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বর্তমানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
তার মতে, প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে উৎপাদন ব্যয় কমানো, পণ্যের মূল্য বাড়ানো, পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা এবং পরিবহন ব্যয় কমানো জরুরি।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দেশটি কত দ্রুত কম খরচের উৎপাদন মডেল থেকে বের হয়ে উচ্চমূল্য সংযোজন, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বৈচিত্র্যময় রপ্তানি কাঠামোর দিকে এগোতে পারে তার ওপর।
আধুনিক কারখানা, উন্নত পণ্য, নতুন বাজার এবং কার্যকর বাণিজ্য চুক্তিই হবে এলডিসি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প টিকিয়ে রাখার প্রধান চাবিকাঠি।

