গ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য ঋণ অনেক সময় জীবিকা টিকিয়ে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলেও, সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ এখন বড় ধরনের আর্থিক চাপে পরিণত হচ্ছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে যাদের আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি অর্থ ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যয় হয়, তাদের সংখ্যা গত এক দশকে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএসের এক গবেষণা অনুযায়ী, গ্রামীণ ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে এই হার ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন। এই শ্রেণির ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি অর্থ কিস্তিতে ব্যয় করা মানুষের হার ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিআইডিএসের গবেষক কাজী ইকবাল সোমবার ঢাকায় আয়োজিত ‘বাংলাদেশে খাদ্য ব্যবস্থার অর্থায়ন: তথ্য ও নীতি আলোচনা’ শীর্ষক এক কর্মশালায় গবেষণার এসব তথ্য তুলে ধরেন। বিআইডিএস ও আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এই কর্মশালার আয়োজন করে। এতে সিজিআইএআর বেটার ডায়েটস অ্যান্ড নিউট্রিশন সায়েন্স প্রোগ্রাম সহায়তা দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রামীণ পরিবারগুলোর ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এই সময়ে ঋণ নেওয়া পরিবারের হার ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে।
গ্রামীণ ঋণের বড় একটি অংশ সরবরাহ করছে বেসরকারি সংস্থা ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো। গবেষণা অনুযায়ী, গ্রামীণ ঋণের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে। তবে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ও ঋণের পরিমাণ বাড়লেও সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে তেমন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়নি।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্যাংক ঋণের সুদের হার যেখানে প্রায় ১০ শতাংশ, সেখানে বেসরকারি সংস্থাগুলো সাধারণত ১৫ শতাংশ ফ্ল্যাট হারে ঋণ দিয়ে থাকে। কার্যকর হিসাবে এই সুদের হার প্রায় ২৭ শতাংশের কাছাকাছি দাঁড়ায়।
অন্যদিকে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে অনেক দরিদ্র মানুষ এখনো মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন। এসব ক্ষেত্রে সুদের হার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে অনেক পরিবার এক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে আরেকটি ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, একই সঙ্গে মহাজন ও বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নেওয়া মানুষের হার ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৯ শতাংশ হয়েছে।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, শুধু ঋণ গ্রহণ করলেই হবে না, সেই ঋণ থেকে আয় ও উৎপাদন বাড়ছে কি না সেটি গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ছাড়া ঋণ গ্রহণ অব্যাহত থাকলে গ্রামীণ পরিবারগুলোর ঋণের বোঝা আরও বাড়তে পারে এবং কৃষকদের একটি অংশ কৃষি থেকে সরে যেতে বাধ্য হতে পারে।
কৃষি সচিব মো. সেলিম খান কর্মশালায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং কৃষি খাতে অর্থায়নের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার বিষয় তুলে ধরেন।
ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণের সর্বোচ্চ সেবা মূল্য ২৪ শতাংশ নির্ধারিত রয়েছে। তিনি ঋণের অর্থায়ন ব্যয় পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
তার মতে, সঞ্চয় সংগ্রহ বাড়ানো এবং ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো গেলে ক্ষুদ্রঋণের খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের বলেন, কৃষি খাতে শুধু উৎপাদনের জন্য অর্থায়ন করলেই হবে না। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের জন্যও অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একটি পৃথক গবেষণায় কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার অর্থায়ন সংকটের বিষয়টিও উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া হারভেস্টার মেশিন মালিকদের মাত্র ৫ শতাংশ ব্যাংক ঋণ ব্যবহার করে যন্ত্র কিনেছেন।
অন্যদিকে যন্ত্র বিক্রেতারা গড়ে হারভেস্টারের মূল্যের ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত অর্থায়ন করেছেন, যা সাধারণত ১৮ মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, হারভেস্টার মালিকদের আয়ের প্রায় ৬৪ শতাংশ আসে এপ্রিল ও মে মাসে। কিন্তু মাসিক কিস্তির নিয়ম থাকায় বছরের বাকি প্রায় নয় মাস তাদের নগদ অর্থ সংকটে পড়তে হয়।
গবেষকরা তাই কৃষি যন্ত্রপাতির ঋণের ক্ষেত্রে মৌসুমি কিস্তি ব্যবস্থা চালু এবং যন্ত্রের বিপরীতে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি কৃষি যন্ত্র ভাড়া দেওয়ার সেবাকে কৃষি কার্যক্রম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ঋণ সুবিধার আওতায় আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ১০৫টি গ্রামের গবাদিপশু খামারিদের নিয়ে পরিচালিত একটি পরীক্ষামূলক অর্থায়ন কার্যক্রমেও ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এই ব্যবস্থায় খামারিরা ঋণ নিয়ে গবাদিপশু পালন করেন এবং সেখান থেকে অর্জিত আয়ের একটি অংশ ঋণদাতাদের সঙ্গে ভাগ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ানো কোনো সমাধান নয়। ঋণকে যদি উৎপাদন বৃদ্ধি, আয় বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করা না যায়, তাহলে তা দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সহায়তার বদলে নতুন আর্থিক সংকট তৈরি করতে পারে।

