জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়ায় সেপ্টেম্বরে দেশে পণ্য আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। গত ৫৩ মাসের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ। এক বছর আগের একই মাসের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। তবে ব্যাংকাররা বলছেন, এই বৃদ্ধির পেছনে আমদানির পরিমাণ বাড়ার চেয়ে পণ্যের দাম বাড়ার প্রভাবই বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, এর আগে সর্বশেষ ২০২২ সালের এপ্রিলে এলসি খোলার পরিমাণ ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল। ওই মাসে খোলা হয়েছিল ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারের এলসি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এ পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৬ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার।
ব্যাংকারদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। ফলে একই পরিমাণ তেল আনতে এখন বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে আমদানির পরিমাণও আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। অর্থাৎ ব্যয় বৃদ্ধি ও আমদানি বৃদ্ধি, দুটি কারণই আছে, তবে ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব বেশি। মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বাড়েনি বলেও তাঁরা জানান। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে সাধারণত সার আমদানি বেশি হয়, আর দাম বাড়ায় সেই খরচও বেড়েছে। একটি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গত মাসে ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সার আমদানি করতে হয়েছে, যা আগে একই পরিমাণের জন্য কম খরচে সম্ভব ছিল।
দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় গ্রুপের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়ছে, বিশেষ করে গত দুই মাসে খরচ অনেক বেশি বেড়েছে। আরেকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কয়েকটি উদাহরণ দেন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, জিংক আমদানিতে আগে প্রতি টনে ৩ হাজার ২০০ ডলার লাগত, এখন লাগছে ৪ হাজার ২০০ ডলার। ফ্ল্যাট স্টিলের খরচ ৫০০ থেকে বেড়ে ৫৭৫ ডলার এবং বিটুমিনের খরচ ৪৫০ থেকে বেড়ে ৬৫০ ডলার হয়েছে। প্রতিবেদনে এককের উল্লেখ নেই, তাই এগুলো সংশ্লিষ্ট নির্বাহীর দেওয়া দরের তথ্য হিসেবেই বিবেচ্য।
প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান ও. রশীদ বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আমদানি খরচ অনেক বেড়েছে। তবে কাঁচামাল আমদানি কিছুটা বাড়াকে তিনি ব্যবসায়িক গতিশীলতায় সামান্য উন্নতির লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ধীরগতিতে হলেও ভবিষ্যতে ব্যবসার কিছুটা সম্প্রসারণ ঘটবে।
ব্যালান্স অব পেমেন্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে পণ্য আমদানি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এই দুই মাসে মোট আমদানি হয়েছে ১২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় জুলাই ও আগস্টে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকে যথেষ্ট ডলার থাকায় এলসি খুলতে কোনো বাধা নেই।
এই চিত্রে ইতিবাচক ও নেতিবাচক, দুই দিকই আছে। ডলারের সরবরাহ স্বস্তিদায়ক হওয়ায় ব্যবসায়ীরা সহজে এলসি খুলতে পারছেন, যা এক সময়ের সংকটের তুলনায় বড় পরিবর্তন। কিন্তু এলসির অঙ্ক বাড়ার বড় কারণ দাম, উৎপাদন বা বিনিয়োগ সম্প্রসারণ নয়। মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি না বাড়ায় নতুন বিনিয়োগের গতি এখনো দুর্বল বলেই মনে হয়।
দ্বিতীয়ত, আমদানি ব্যয় বাড়লে বাণিজ্য ঘাটতি ও ডলারের ওপর চাপ বাড়ে। রপ্তানি ও রেমিট্যান্স একই হারে না বাড়লে সময়ের সঙ্গে এই চাপ ব্যাংকিং খাত ও বিনিময় হারে প্রভাব ফেলতে পারে। আমদানি পণ্যের দাম বাড়লে দেশের বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে কিছু বিষয় অস্পষ্ট। এলসি খোলার বৃদ্ধির কত অংশ দাম ও কত অংশ পরিমাণের কারণে, তার সুনির্দিষ্ট ভাগ প্রতিবেদনে নেই। জ্বালানি, সার ও কাঁচামালের আলাদা হিসাবও পাওয়া যায়নি। এলসি খোলা মানে পণ্য আসা নয়, তাই প্রকৃত আমদানির চিত্র আসবে পরবর্তী মাসগুলোর তথ্যে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে দামের চাপ আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের রেকর্ড এলসি মূলত ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিফলন। আগামী মাসগুলোতে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কতটা বাড়ে, সেটিই অর্থনীতির প্রকৃত গতি বোঝার মাপকাঠি হবে।

