চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআইয়ের নিট প্রবাহ কমেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে দেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৭৯ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ দশমিক ০৬ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ৩০ কোটি ৯৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
তবে বিনিয়োগের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পতনের মূল কারণ নতুন মূলধন প্রবাহ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণের পরিমাণ কমে যাওয়া। অন্যদিকে দেশে থাকা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে।
২০২৫ সালের প্রথমার্ধে নতুন বিদেশি মূলধন বা নিট ইক্যুইটি ক্যাপিটাল এসেছিল ৩৪ কোটি ৫১ লাখ ৭০ হাজার ডলার। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৫৬ লাখ ৮০ হাজার ডলারে।
একই সময়ে আন্তঃকোম্পানি ঋণের প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে এই খাতে নিট বিনিয়োগ ছিল ৩৯ কোটি ৯৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যা চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে কমে হয়েছে মাত্র ৩ কোটি ৪৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
অন্যদিকে বিদেশি কোম্পানিগুলোর দেশে অর্জিত মুনাফা পুনরায় ব্যবসায় বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে পুনর্বিনিয়োগ করা আয় ছিল ৩৫ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যা চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ কোটি ৩৮ লাখ ৩০ হাজার ডলারে।
এতে বোঝা যায়, দেশে আগে থেকে থাকা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসায় আস্থা রেখে পুনরায় বিনিয়োগ করছে, তবে নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টর্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি বা এফআইসিসিআইয়ের নেতারা মনে করছেন, নতুন বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আগে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
এফআইসিসিআইয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যদি নতুন করে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন, তাহলে নতুন বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করা সহজ হবে। সরকারের নিয়ন্ত্রক পরিবেশ ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি হলে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের শেয়ারহোল্ডারদের রাজি করিয়ে পুনর্বিনিয়োগ বাড়াতে পারবে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধিরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়। তাদের মতে, জ্বালানি খাতে রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়, তবে একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও পূর্বানুমানযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
কারখানাগুলো যাতে প্রতিযোগিতামূলক ব্যয়ে উৎপাদন করতে পারে, সে জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিনিয়োগবান্ধব মনোভাব এবং বাজেটে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর পুরোপুরি প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের করনীতি ও কর আদায়ের পদ্ধতি। তাদের অভিযোগ, চলতি বছর রাজস্ব আদায়ে ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের জন্য এনবিআর নিয়মিত কর দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর আগের ১০ বছরের নথি যাচাই করে অতিরিক্ত করের চাপ তৈরি করছে।
বিনিয়োগকারীদের মতে, নিয়ম মেনে কর দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হলে নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে সতর্ক হয়ে যেতে পারেন।
তবে বহুজাতিক কোম্পানির বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত সাধারণত দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়। এসব প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগের সুযোগ বিবেচনা করে এবং স্থিতিশীল নীতি, সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ ও উৎপাদন ব্যয়ের ভিত্তিতে বিনিয়োগের স্থান নির্বাচন করে।
এদিকে ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিট এফডিআই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়ে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা। নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণের ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ সময়ে নিট এফডিআই ছিল ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার ডলার। সে হিসাবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে নিট প্রবাহ কমেছে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে পুনর্বিনিয়োগ করা আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৫ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়ে ২৬ কোটি ৯ লাখ ১০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে নিট ইক্যুইটি মূলধন কমে হয়েছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। আন্তঃকোম্পানি ঋণের প্রবাহও কমে দাঁড়িয়েছে ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলারে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, শুধু ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ২৮ শতাংশ পতনের তথ্য দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। তার মতে, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে নিট এফডিআই অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিল, কারণ ওই সময়ে আন্তঃকোম্পানি ঋণের মাধ্যমে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ এসেছিল।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের এফডিআইয়ের ভিত্তি এখনো তুলনামূলক ছোট। ফলে একটি বা দুটি বড় বিনিয়োগের সময় পরিবর্তনের কারণে প্রান্তিক বা অর্ধবার্ষিক হিসাবে বড় ওঠানামা দেখা স্বাভাবিক।
তার মতে, কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বিনিয়োগ প্রবাহের চেয়ে বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক উন্নয়নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নাহিয়ান রহমান আরও বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানির উচ্চ মূল্যের মধ্যেও বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগ বৃদ্ধি দেশে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার প্রতি আস্থার ইঙ্গিত দেয়।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের পাশাপাশি প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইনে থাকা প্রকল্পগুলোকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দেওয়ার জন্য কাজ চলছে।
চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল প্রকল্পের উন্নয়ন কাজ এগিয়ে চলছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে তা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এই অঞ্চল ঘিরে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে শুধু নতুন বিনিয়োগের প্রচার যথেষ্ট নয়। বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা, জ্বালানি সংকট সমাধান, কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল, নির্ভরযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

