মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে দেশের নিজস্ব জ্বালানি উৎস ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আমদানিনির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ হ্রাস এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের সম্ভাবনাময় কয়লাখনিগুলো উন্নয়নের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
এই উদ্যোগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনিকে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের আন্দোলন, পরিবেশগত উদ্বেগ এবং বিভিন্ন জটিলতার কারণে আটকে থাকা এই খনি নতুন কাঠামোর মাধ্যমে উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ফুলবাড়ী কয়লাখনি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উন্নয়নের পাশাপাশি জমির মালিকদের সঙ্গে মুনাফা ভাগাভাগির একটি পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা চলছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, খনির জন্য জমি ইজারা নেওয়ার বিনিময়ে মালিকদের অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ মুনাফার একটি অংশ তাদের মধ্যে বণ্টন করা হতে পারে।
এ ছাড়া ইজারার মেয়াদ শেষে জমি ফেরত দেওয়া, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আবাসন সুবিধা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের বিষয়গুলোও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের পুনর্বাসন, কৃষিজমি রক্ষা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর প্রভাব এবং পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রকৌশলগত, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত ৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেশের নিজস্ব কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা নিয়ে একটি উপস্থাপনাও দেওয়া হয়েছে। সেখানে বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী ও দিঘিপাড়া কয়লাখনির বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি জামালগঞ্জ খনির সমীক্ষা এবং অন্যান্য খনির অগ্রগতিও নিয়মিত পর্যালোচনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ফুলবাড়ী খনি উন্নয়নের বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, খনির জন্য ইজারা দেওয়া জমির মালিকদের সঙ্গে মুনাফা ভাগাভাগির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়ার পর চূড়ান্ত পরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস উত্তোলনের পাশাপাশি কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। ফুলবাড়ী কয়লাখনিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে সব ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ফুলবাড়ী, পার্বতীপুর, বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার খনিসংলগ্ন এলাকার জমির মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা সম্ভাব্য নতুন ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারেন। জমির ইজারা বাবদ অর্থের পাশাপাশি খনির মুনাফার একটি অংশ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ফুলবাড়ী কয়লাখনিতে প্রায় ৫৭২ মিলিয়ন টন উন্নতমানের বিটুমিনাস কয়লার মজুদ রয়েছে বলে তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭৫ মিলিয়ন টন উত্তোলনযোগ্য বলে ধারণা করা হয়। খনিটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা গেলে বছরে প্রায় দেড় কোটি টন কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে খনি উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় একটি বিষয় হলো পুনর্বাসন। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের মতে, ফুলবাড়ী খনি এলাকায় প্রায় ১০ হাজার একর জায়গাজুড়ে ৪০ হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে। খনি উন্নয়নের জন্য প্রায় ৪৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রয়োজন হতে পারে। ফলে জমি অধিগ্রহণ, বসতবাড়ি স্থানান্তর, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।
ফুলবাড়ী কয়লাখনি উন্নয়নের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক জিসিএম রিসোর্সেস পিএলসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান এশিয়া এনার্জি করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটি এর আগে খনিটির সম্ভাব্যতা যাচাই করে উন্নয়ন পরিকল্পনা জমা দিয়েছিল।
পরবর্তীতে খনির পাশে সর্বোচ্চ এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়। তবে স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের কারণে প্রকল্পটি আর এগোয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ এবং স্থানীয় জনগণের সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে গ্রহণযোগ্য কাঠামোর অভাব ছিল। এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্থানীয় মানুষকে প্রকল্পের অংশীদার করার চিন্তা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বড় অংশের কয়লা আমদানি করে। দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা সাত হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে প্রায় দুই কোটি থেকে দুই কোটি ২০ লাখ টন কয়লা আমদানি করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কয়লা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১৯ কোটি মার্কিন ডলার।
ফুলবাড়ী, বড়পুকুরিয়া নর্থ এবং দিঘিপাড়া খনি থেকে যথাক্রমে বছরে দেড় কোটি, ৬০ লাখ এবং ৩০ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করা গেলে দেশের কয়লা সরবরাহে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ফুলবাড়ী খনি চালু হলে দেশের কয়লা আমদানির সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত স্থানীয় কয়লা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন নির্ভর করবে উত্তোলনযোগ্য মজুদ, উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদার ওপর।
বাংলাদেশে বর্তমানে পাঁচটি কয়লাখনি রয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া খনি থেকে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে পরিচালিত এই খনিতে ২০০৫ সালে উৎপাদন শুরু হয় এবং গত প্রায় ২১ বছরে সেখান থেকে প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত ও পরিবেশগত ঝুঁকি আগে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। যে প্রতিষ্ঠানই খনির উন্নয়ন করুক না কেন, ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা মোকাবিলার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ঝুঁকি সীমিত এবং তা মোকাবিলা করা সম্ভব হলে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে এগোনো যেতে পারে। তবে ঝুঁকি বেশি হলে প্রকল্পটি বাদ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
এদিকে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের পাশাপাশি নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা, উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি এবং দেশীয় গ্যাসের মজুদ কমে আসার কারণে কয়লাকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে দুই হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের মাতারবাড়ী ও পটুয়াখালীর পায়রায় এসব কেন্দ্র নির্মাণে তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, এলএনজির তুলনায় কয়লার উৎস ও সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে কয়লা আমদানির ব্যবস্থা করা গেলে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, সাম্প্রতিক জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দেশীয় কয়লা উত্তোলনের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের গ্রহণযোগ্যতার ওপর।

