বণিক বার্তার এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের যোগান বাড়ানোর উদ্দেশ্যে সিলেটে গৃহীত একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় আটকে পড়েছে। জৈন্তাপুর উপজেলার ডুপিটিলা ১ এবং গোলাপগঞ্জের কৈলাসটিলা ৯ নম্বর অনুসন্ধান কূপ থেকে আগামী ১০ বছরে মোট ৫৬ বিলিয়ন ঘনফুট বা বিসিএফ গ্যাস উত্তোলনের লক্ষ্য নেওয়া হলেও, বিগত দুই বছরে এই প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো মূল কাজই শুরু করা সম্ভব হয়নি। সরকারি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড বা এসজিএফএল প্রায় ৬৪৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের বিপরীতে মাত্র ১৬ শতাংশ ভৌত অগ্রগতি দেখাতে পেরেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ার পর এখন মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর জন্য নতুন প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে সংস্থাটি।
মূলত ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর কাগজপত্রে যাত্রা শুরু করা এই প্রকল্পের অধীনে স্থানীয় জমিতে কৃষি আইন ও হুকুম দখলের নিয়ম প্রয়োগ করতে গিয়েই বিপত্তির সূচনা হয়। জমির মালিকদের প্রবল আপত্তি এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণের ধীরগতির কারণে মূল খনন কাজ ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের বা আইএমইডির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পে আর্থিক ব্যয় হয়েছে মোট বাজেটের মাত্র ৮.৩৯ শতাংশ। নিয়মানুযায়ী জমি পাওয়ার আগে কিংবা আইনিভাবে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ করার আগেই কূপ সাইটে পূর্ত কাজ বা সিভিল ওয়ার্ক শুরু করায় আপত্তি তুলে আইএমইডি পুরো প্রক্রিয়াটি আরও খতিয়ে দেখার সুপারিশ করেছে।
আইএমইডির দেওয়া মাঠপর্যায়ের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ডুপিটিলা ১ কূপ খননের উদ্দেশ্যে নির্ধারিত ৭৮৩ মিটার সংযোগ সড়কের মধ্যে মাত্র ২৩২ মিটারের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়েছে, যা মোট দূরত্বের তিন ভাগের এক ভাগেরও কম। বর্তমানে অবশিষ্ট ৫৫১ মিটারে ছোট সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের পাশাপাশি কূপ এলাকায় বালি ভরাটের কাজ চলছে। অন্যদিকে কৈলাসটিলা ৯ নম্বর কূপে ভূমি উন্নয়ন তো দূরের কথা, বাস্তবে কোনো অগ্রগতির ছাপই এখনো তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ফলে পাইপলাইন স্থাপন, সীমানাপ্রাচীর ও ড্রেনেজ সিস্টেমের মতো অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ অনেক দূরের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডুপিটিলা ও কৈলাসটিলা কূপ খনন প্রকল্পে সরকারি তহবিল থেকে প্রায় ৪১৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং এসজিএফএলের নিজস্ব তহবিল থেকে বাকি ২৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকা জোগান দেওয়ার কথা রয়েছে। ভূতাত্ত্বিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ডুপিটিলা কাঠামোয় ৩,৪৫০ মিটার এবং কৈলাসটিলায় ৩,৬০০ মিটার গভীরে ড্রিলিং চালিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের অস্তিত্ব খোঁজা হবে। অর্থনৈতিক প্রাক্কলন বলছে, কাঙ্ক্ষিত গ্যাস পাওয়া গেলে প্রথম ৫ বছর দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং পরবর্তী ৫ বছর দৈনিক ১২ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে পারে। ফলে আমদানিকৃত অতি ব্যয়বহুল এলএনজির ওপর নির্ভরতা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হতো।
এসজিএফএল ইতোমধ্যে প্রকল্পের ডিজাইন ও গভীরতায় কিছুটা পরিবর্তন এনে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি পুনর্গঠন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। কমিশনের পিইসি বা প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির বৈঠকেও স্থান পেয়েছে এই নতুন প্রস্তাব। শিল্প ও শক্তি বিভাগের তৈল, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ উইংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নকশার পরিবর্তন ও প্রায় শূন্য অগ্রগতির পেছনের কারণ যাচাই করে ডিপিপি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যেহেতু কাজের গতি অত্যন্ত সীমিত এবং প্রকল্পের নকশাতে বড় পরিবর্তন এসেছে, তাই ডিপিপি অনুমোদন পেতে হলে একনেক সভার চূড়ান্ত সায় প্রয়োজন হতে পারে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে রিগ নামিয়ে ড্রিলিং শুরু করতে ঠিক কতটা সময় লাগবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

