খাগড়াছড়ির পাহাড়ে উৎপাদিত আম, আনারস, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে ও আদা-হলুদ বিদেশের বাজারে রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়, সড়কে অবৈধ চাঁদাবাজি এবং সংরক্ষণসুবিধার ঘাটতি দূর করা জরুরি বলে মনে করছেন কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
পাহাড়ি কৃষিপণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সম্প্রতি খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে চাষি ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) উদ্যোগে এবং উপজেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবলস অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগিতায় আয়োজিত এ কর্মশালায় কৃষিপণ্যের মান উন্নয়ন, বাজার সম্প্রসারণ ও রপ্তানির প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়।
কর্মশালায় ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী পাহাড়ে উৎপাদিত বিভিন্ন ফল এবং মসলার আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, আম, কলা, কাঁঠাল, আনারস, পেঁপে এবং আদা-হলুদের মতো কৃষিপণ্য যথাযথ মান বজায় রেখে উৎপাদন ও বাজারজাত করা গেলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে এগুলোর চাহিদা তৈরি করা সম্ভব। এ জন্য উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণ, রাসায়নিকের নিরাপদ ব্যবহার এবং ফসল সংগ্রহ থেকে শুরু করে বাছাই ও মোড়কজাতকরণ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে হবে।
তবে রপ্তানির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পণ্য পরিবহনের বাড়তি খরচ। স্থানীয় চাষি ও কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, পাহাড় থেকে সমতলে কৃষিপণ্য পরিবহনের সময় সরকারি টোলের বাইরে বিভিন্ন স্থানে অবৈধ চাঁদা দিতে হয়। এতে উৎপাদন খরচের সঙ্গে পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যায়। বিশেষ করে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকেরা এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে ন্যায্য মুনাফা থেকে বঞ্চিত হন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রেও এটি বড় প্রতিবন্ধকতা হতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো আধুনিক হিমাগার ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণকেন্দ্রের অভাব। মৌসুমে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ফল বাজারে আসায় সরবরাহ বেড়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ফল সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক বাগানমালিক দ্রুত পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে বাজারে দাম কমে যাওয়ার পাশাপাশি অবিক্রীত ফল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। অথচ যথাযথ সংরক্ষণ, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা থাকলে এসব পণ্যের অপচয় কমানো এবং বাজারজাতকরণের সময় বাড়ানো সম্ভব।
কর্মশালায় কৃষিপণ্য বিপণন সহজ করা, সড়কে অননুমোদিত চাঁদাবাজি বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। এ ছাড়া বিদেশি ক্রেতা খোঁজা, বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ এবং রপ্তানির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির বিষয়ে চাষি ও উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দেওয়া হয়।
কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পাহাড়ি কৃষিপণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে শুধু প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। উৎপাদনের মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, আধুনিক সংরক্ষণসুবিধা, প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো এবং কৃষকদের বাজারসংযোগ বাড়াতে হবে। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে পাহাড়ের কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন আয়ের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

