ক্ষুদ্রঋণ নেওয়া কোনো গ্রাহকের মৃত্যু হলে তাঁর অবশিষ্ট মূল ঋণ পুরোপুরি মওকুফ করতে হবে। মৃত্যুর পর কোনো সার্ভিস চার্জও আদায় করা যাবে না। এই সুবিধা দিতে ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে বিতরণ করা ঋণের সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হারে ফি নেওয়া যাবে। ক্ষুদ্রঋণ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) গতকাল সোমবার এক সার্কুলারে এ নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে সব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে এ জন্য আলাদা তহবিল গঠন করতে বলা হয়েছে।
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনা এবং গ্রাহকের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতেই নতুন এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এমআরএ।
সার্কুলার অনুযায়ী, ঋণ মওকুফের পাশাপাশি মৃত গ্রাহকের জমা করা সঞ্চয় মুনাফাসহ দ্রুত নমিনি বা বৈধ উত্তরাধিকারীকে ফেরত দিতে হবে। মৃতের পরিবারকে দাফন বা সৎকারের জন্য এককালীন কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়াও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুধু গ্রাহক নন, তাঁর অভিভাবক বা পরিবারের প্রধান উপার্জনকারীর মৃত্যু হলেও একই সুবিধা পাওয়া যাবে।
প্রতিটি ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানকে ‘গ্রাহক কল্যাণ তহবিল’ নামে একটি পৃথক তহবিল গঠন করতে হবে। বিতরণ করা ঋণের ওপর সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হারে অর্থ আদায় করে এই তহবিল তৈরি করা যাবে। ঋণ দেওয়ার সময়ই গ্রাহককে লিখিতভাবে জানাতে হবে, কত টাকা কাটা হচ্ছে, কেন কাটা হচ্ছে এবং এর বিনিময়ে তিনি কী সুবিধা পাবেন।
সুবিধা পরিশোধের সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছে এমআরএ। দাফন বা সৎকারের অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে দিতে হবে। আর ঋণ মওকুফ ও সঞ্চয় ফেরত দিতে হবে সর্বোচ্চ ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে। এ জন্য মৃত্যুসনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো ন্যূনতম প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিতে হবে। তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্বৃত্ত থেকে দাবি মেটাতে হবে, যা সামাজিক খাতের ব্যয় হিসেবে গণ্য হবে।
তহবিলের অর্থ ব্যবহারেও কড়াকড়ি আছে। এই অর্থ কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় হিসেবে দেখানো বা অন্য খাতে সরানো যাবে না। তবে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে উদ্বৃত্ত অর্থ ক্ষুদ্রঋণ হিসেবে বিতরণ করা কিংবা শুধু তফসিলি ব্যাংকে বিনিয়োগ করা যাবে। তহবিলের হিসাব আলাদাভাবে রাখতে হবে, আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করতে হবে এবং বহিঃনিরীক্ষক দিয়ে নিরীক্ষা করাতে হবে।
এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, আগে থেকেই গ্রাহক কল্যাণ তহবিল ছিল, কিন্তু এর গঠন ও ব্যবহারের কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড ছিল না। গ্রাহক বা পরিবারের প্রধানের মৃত্যুতে ঋণ আদায় নিশ্চিত করার নামে প্রতিষ্ঠানগুলো এক থেকে দেড় শতাংশ পর্যন্ত ফি নিত। অথচ মৃত্যুজনিত ঋণ মওকুফে এই তহবিলের এক-তৃতীয়াংশ অর্থও খরচ হতো না। তাই ফির হার, তহবিলের ব্যবহার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবার নীতিমালা করা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে ফির হারে। এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, আগে অনেক প্রতিষ্ঠান এক থেকে দেড় শতাংশ ফি নিলেও প্রকৃত খরচ হতো তার এক-তৃতীয়াংশেরও কম। এখন সর্বোচ্চ সীমা শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বেঁধে দেওয়ায় ঋণগ্রহীতাদের ওপর বাড়তি চাপ কমার সুযোগ তৈরি হলো। তবে শুধু হার কমালেই হবে না, ফি কাটার সময় গ্রাহককে লিখিতভাবে জানানোর বাধ্যবাধকতা ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না, সেটিও নজরে রাখতে হবে।
মৃত্যুর পর পরিবারের ওপর ঋণের বোঝা থাকবে না, দাফনের খরচও মিলবে, এতে সংকটের সময়ে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতার পরিবার অন্তত কিছুটা স্বস্তি পাবে। আবার তহবিলের টাকা আলাদা রাখা, নিরীক্ষা করানো ও প্রকাশ করার শর্ত থাকায় অর্থের অপব্যবহারের ঝুঁকিও কমবে। তবে বাস্তবে এসব নির্দেশনা সব প্রতিষ্ঠান কতটা মানছে এবং ৩০ কর্মদিবসের সময়সীমা কতটা রক্ষা হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগের সাফল্য।

