ব্যাংককে চলমান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিশ্বব্যাংকের কাছে আগামী দুই বছরের জন্য বিশেষ আর্থিক সুরক্ষাবলয় বা ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেফটি নেট’ চেয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত জাতীয় সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অজয় বঙ্গার মধ্যে বর্তমান অর্থনৈতিক রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তবে এই প্রস্তাবিত সুরক্ষাবলয়ের আওতায় অর্থায়নের চূড়ান্ত পরিমাণ এবং শর্তাবলি এখনও নির্ধারিত হয়নি; একই সঙ্গে বাজারে ছড়িয়ে পড়া অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা চাওয়ার খবরকে স্রেফ গুঞ্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থনৈতিক রূপান্তরের এই মধ্যবর্তী সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় বাজেট অর্থায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই মূলত এই ২ বছরের সুরক্ষাবলয়ের প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের যৌথ এবং সমন্বিত অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে অন্যান্য আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও কম সুদে দীর্ঘমেয়াদী সাহায্য পাওয়া সহজ হবে। এর ফলে বিশ্ববাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে অত্যন্ত ইতিবাচক ও আস্থাভাজন বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে অর্থায়নের চূড়ান্ত শর্ত ও অঙ্কের পরিমাণ নির্ধারণ করতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে এবং ঢাকায় কর্মপর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে এর ফলোআপ অব্যাহত থাকবে।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত আরআরআইপি কৌশলের ভিত্তিতে আগামী জুনের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের নতুন ‘কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক’ বা সিপিএফ চূড়ান্ত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। নতুন এই অংশীদারিত্ব কাঠামোয় মূলত সারের মতো জরুরি কাঁচামাল আমদানি, এসএমই খাতের বিকাশ, ব্যাংক সংস্কার ও বাণিজ্য সহজীকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, প্রকল্প বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা কমাতে বড় ধরণের সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত কোনো প্রকল্প শেষ হতে গড়ে ৭ বছর সময় লাগে, যা কমিয়ে ৫ বছরে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এমনকি প্রকল্প অনুমোদনের সরকারি সময়সীমা ১৮ মাস থেকে কমিয়ে মাত্র ৬ মাসে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগের চাকা সচল করতে ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ কমানো ও সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়গুলো বিশ্বব্যাংকের অঙ্গসংস্থা আইএফসি এবং এমআইজিএর সাথে আলোচনায় স্থান পেয়েছে। পুঁজিবাজারে সম্পূর্ণ স্বাধীন পেশাদার কমিশন গঠন, রাজস্ব নীতি ও প্রশাসনকে আলাদা করা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের স্বয়ংক্রিয়করণের ওপর বিশ্বব্যাংক তাদের সমর্থন পুনঃব্যক্ত করেছে। সার্বিকভাবে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান অর্থনৈতিক নীতি ও সংকটের মধ্যে নেওয়া বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচির ওপর তাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো সংগৃহীত বৈশ্বিক ঋণ বা সাহায্যকে শুধু সরকারের পরিচালন ব্যয় বা চলতি খরচে অপচয় না করে সরাসরি উৎপাদনশীল খাতে রূপান্তর করা। কর্মসংস্থান তৈরি করা না গেলে সাধারণ মানুষের চলমান আর্থিক সংকট ও মূল্যস্ফীতি কমবে না। তাই অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিরাপত্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সরাসরি ঋণ সহায়তা প্রদান করে আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে একটি মজবুত ও টেকসই ভিত্তিতে দাঁড় করানোর ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী।

