বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের নেওয়া নীতির সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সমঝোতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার দ্বিতীয় দিনে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি নানা ধরনের সংকটের মধ্যে ছিল। আগের সময়ের দায়দায়িত্বের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপও সরকারকে সামলাতে হচ্ছে। বাংলাদেশের এসব চ্যালেঞ্জ বিশ্বব্যাংক বুঝতে পারছে এবং সংকট কাটাতে সরকারের নেওয়া অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে সংস্থাটির মতের মিল রয়েছে।
জ্বালানি খাতে বাড়তি ভর্তুকির চাপ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে মোট ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রসঙ্গ এসেছে।
তবে অর্থমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, এই আলোচনা এখনো প্রাথমিক ও চলমান পর্যায়ে রয়েছে। কোনো আর্থিক সহায়তা বা নির্দিষ্ট অঙ্কের ঋণকে এখনই চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে আরও বৈঠক ও পর্যালোচনা হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংককে চলমান বৈঠকগুলো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা নয়। বরং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংক কোন পথে এগোবে, কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন হবে এবং কোন খাতে সহযোগিতা বাড়ানো হবে—এসব বিষয়ে ভিত্তি তৈরি হচ্ছে।
ঢাকাতেও এ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে বাংলাদেশ সন্তুষ্ট এবং সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর দাবি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার যে পদ্ধতি ও নীতি গ্রহণ করেছে, বিশ্বব্যাংক তার সঙ্গে একমত হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের আলোচনা কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে, সে বিষয়েও একটি কাঠামোগত বোঝাপড়া হয়েছে।
এর আগে বার্ষিক সভার প্রথম দিনে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘দেশীয় অংশীদারত্ব কাঠামো’ চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী তিন বছরে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতার ক্ষেত্র ও অগ্রাধিকার এই কাঠামোর মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি লিখিত প্রস্তাব বিশ্বব্যাংকের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি বিভিন্ন পরামর্শ ও সুপারিশ দিয়েছে এবং বাংলাদেশও নিজেদের অগ্রাধিকার ও প্রস্তাব তুলে ধরেছে।
অর্থমন্ত্রীর মতে, এই আলোচনা থেকে দুই পক্ষের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার পথ আরও পরিষ্কার হবে।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পাশে থাকতে আগ্রহী বলেও দাবি করেন তিনি। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পর মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে দেশকে কোন পথে এগিয়ে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের অবস্থানের মিল রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
তবে বিশ্বব্যাংকের সম্ভাব্য অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার বিষয়টি নিয়ে তিনি সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন খবরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আলোচনা আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়।
তার মতে, বর্তমান পর্যায়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অর্থায়নের কাঠামো, নীতিগত সহায়তা এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট অর্থায়নের সিদ্ধান্ত এ প্রক্রিয়ার পরবর্তী পর্যায়ে আসতে পারে।
মূল্যস্ফীতি ও মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পূর্বাভাস প্রসঙ্গেও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সরকার কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাসকে বিতর্কিত করতে চায় না। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব তথ্য, পদ্ধতি ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক পূর্বাভাস দেয়।
সরকার নিজেদের বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কাজ করছে এবং সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে নির্বাচনি ইশতেহারেরও সামঞ্জস্য রয়েছে। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারত্বের কাঠামো কেমন হবে, সে বিষয়ে লিখিত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ ও বাংলাদেশের প্রস্তাব নিয়ে দুই পক্ষ এখন আলোচনা করছে।
বর্তমান আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি আগামী কয়েক বছরের উন্নয়ন ও অর্থায়নের একটি কাঠামো তৈরি করতে চাইছে।
তবে ১০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত সহায়তা পাওয়া যাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আরও কয়েক মাস আলোচনা, পর্যালোচনা এবং পরবর্তী বৈঠকের প্রয়োজন হবে।
অর্থাৎ বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোলেও এখন পর্যন্ত মূল বিষয়টি নীতিগত সমঝোতা ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার কাঠামো তৈরির পর্যায়েই রয়েছে। সম্ভাব্য বড় অঙ্কের অর্থসহায়তার বিষয়টি এখনো আলোচনাধীন।

