জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড বাতিল করে খালাস চেয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।
এ জন্য আপিলে ২৩টি যুক্তি তুলে ধরেছেন তাঁর আইনজীবী ব্যারিস্টার সিফাত মাহমুদ। এর মধ্যে চারটি প্রধান যুক্তির কথা জানিয়েছেন তিনি। আইনজীবীর দাবি, ইনুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ যথেষ্ট সাক্ষ্য, তথ্য ও নথি উপস্থাপন করতে পারেনি।
বুধবার আইনজীবী সিফাত মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিলটি করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সাজা বাতিল করে ইনুকে খালাস দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
যে চার যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে
সাক্ষ্যপ্রমাণ যথেষ্ট নয়
আপিলে বলা হয়েছে, ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণে প্রসিকিউশন পর্যাপ্ত সাক্ষ্য, তথ্য ও উপাত্ত দিতে পারেনি। আইনজীবীদের দাবি, কেবল পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে দেখানোর অভিযোগ
ইনুর বিরুদ্ধে মামলায় শেখ হাসিনার সঙ্গে কথোপকথন, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথিত যোগাযোগ, ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত এবং গণমাধ্যমে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যকে প্রসিকিউশন অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
তবে আপিলে ইনুর পক্ষের দাবি, এসব কর্মকাণ্ড থেকে কোনো ফৌজদারি অপরাধ তো প্রমাণিত হয়নি, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগও প্রতিষ্ঠিত হয় না। এরপরও এসব বিষয়কে ভিত্তি করে তাঁকে সাজা দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতার অভিযোগ
আপিলে আরও বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের রায়েই তদন্ত কর্মকর্তার জেরার বরাতে তদন্তের বিভিন্ন ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে।
ইনুর আইনজীবীদের দাবি, তদন্তটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ, আংশিক ও একপাক্ষিক। তাঁরা এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেছেন। এমন তদন্তের ওপর ভিত্তি করে দণ্ড দেওয়া সঠিক হয়নি বলে আপিলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলাই ও আগস্টের ঘটনাবলির প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে বিবেচনা না করার অভিযোগ
আপিলে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের ঘটনাগুলোর প্রকৃত প্রেক্ষাপট ও বাস্তব চিত্র যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি ট্রাইব্যুনাল।
ইনুর পক্ষের আইনজীবীদের দাবি, ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত রাজনৈতিক বয়ানের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে মামলায় অনুমাননির্ভর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত এসেছে বলে আপিলে দাবি করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে ১০ বছরের সাজা
গত ৩০ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২ ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় দেন। তাঁর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিটি অভিযোগে তাঁকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে সাজাগুলো একসঙ্গে কার্যকর হওয়ার কারণে মোট কারাভোগের মেয়াদ নির্ধারিত হয় ১০ বছর।
ইনুর আইনজীবীদের দাবি, অভিযোগগুলোর পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকা এবং তদন্তের ত্রুটি বিবেচনায় নিয়ে ট্রাইব্যুনালের রায় বাতিল করা উচিত। এ কারণেই আপিলে দণ্ড বাতিল করে তাঁকে খালাস দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
ইনুর সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চায় রাষ্ট্রপক্ষ
অন্যদিকে ইনুর সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষও। গত ৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
ফলে একই মামলায় ইনুর পক্ষ থেকে খালাস চেয়ে আপিল এবং রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন। দুই পক্ষের আবেদনের ওপর আদালতের সিদ্ধান্তেই মামলার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারিত হবে।

