সরকারি ব্যয় মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ নেওয়ার তুলনায় ৬ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করেছিল সরকার। এক বছরের ব্যবধানে এই পরিবর্তন সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকঋণের ওপর বাড়তে থাকা নির্ভরতার বিষয়টি সামনে এনেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১ হাজার ১৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার।
চলতি অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে মোট ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই সেই লক্ষ্যমাত্রার ২১ দশমিক ৬৫ শতাংশ পূরণ হয়েছে। অর্থাৎ, বছরের শুরুতেই সরকার তার নির্ধারিত ব্যাংকঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার করেছে।
সরকারের ঋণ নেওয়ার এই প্রবণতার পেছনে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, সরকারি ব্যয় চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ রাজস্ব থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে সংগ্রহ করা না গেলে ঘাটতি পূরণে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি ব্যয় নির্বাহের সুযোগ তৈরি হলেও অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে।
সরকারের নিয়মিত ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিভিন্ন ভর্তুকি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়। এসব খাতে অর্থের প্রয়োজন নিয়মিত থাকলেও রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে সরকারকে বিকল্প অর্থায়নের পথ খুঁজতে হয়। ব্যাংকঋণ তখন সেই ঘাটতি পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
তবে রাজস্ব ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে কিছু অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। সরকার যখন ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার নেয়, তখন ব্যাংকগুলোর অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি ঋণের জোগানে ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বা আগ্রহ প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য যখন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রয়োজন হয়, তখন এ ধরনের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে ঋণ দেওয়ার সুদের হার কমে আসায় ব্যাংকগুলোর আয় ও মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ঋণের চাহিদা বাড়লে ব্যাংকগুলোর অর্থ ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হতে পারে। ঋণের সুদ থেকে আয় কমে গেলে আমানতকারীদের মুনাফা বা সুদ পরিশোধ, পরিচালন ব্যয় মেটানো এবং সামগ্রিক লাভ ধরে রাখার ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলোকে বাড়তি হিসাব করতে হয়।
সরকারের জন্য ব্যাংকঋণ নেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বাজেটের ঘাটতি মেটাতে অনেক দেশই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। তবে ঋণের পরিমাণ, ব্যয়ের উদ্দেশ্য এবং সেই অর্থ ব্যবহারের দক্ষতা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ নিয়ে যদি উৎপাদনশীল অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো যায়, তাহলে ভবিষ্যতে অর্থনীতির সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ঋণের চাপ সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু ঋণ যদি মূলত নিয়মিত ব্যয়ের ঘাটতি পূরণেই ব্যবহৃত হয় এবং রাজস্ব আদায়ের কাঠামোগত দুর্বলতা থেকে যায়, তাহলে একই ধরনের ঋণনির্ভরতা বারবার ফিরে আসতে পারে।
এ কারণে সরকারের সামনে রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করার দ্বৈত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি কমানো, রাজস্ব প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনা করা গেলে ব্যাংকঋণের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের ঋণের পরিসংখ্যান তাই শুধু সরকারের অর্থের চাহিদাই তুলে ধরে না; এটি রাজস্ব সংগ্রহ, ব্যাংকব্যবস্থার সক্ষমতা এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে আনে। নির্ধারিত ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ লক্ষ্যমাত্রার কতটা শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করতে হবে, তা নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোতে রাজস্ব আদায় ও সরকারি ব্যয়ের গতিপ্রকৃতির ওপর।
রাজস্ব আয় বাড়ানো না গেলে ব্যাংকঋণের প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে। আর সেই ঋণ যদি ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন সক্ষমতা ও মুনাফার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে তার প্রভাব বৃহত্তর অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই সাময়িক অর্থের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে রাজস্ব ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং ঋণের ব্যবহারকে আরও কার্যকর ও টেকসই করা।

