ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান লিখিত এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে জীবনযাত্রার খরচ বা মূল্যস্ফীতির গতির সাথে তাল মেলাতে পারছে না সাধারণ মানুষের মজুরি বৃদ্ধি। সরকারি পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা ৫৬ মাস বা সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাপিয়ে গেছে। ফলে খাদ্যসামগ্রী কেনা, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হারাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মজীবী মানুষ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ওয়েজ রেট ইনডেক্স বা মজুরি হার সূচকের তথ্যানুযায়ী, কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ৬৩টি পেশার কম মজুরি পাওয়া দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির হার গত আগস্টের ৮.০৫ শতাংশ থেকে কমে সেপ্টেম্বরে ৭.৯ শতাংশে নেমে এসেছে। জেনারেল অর্থনৈতিক বিভাগ বা জিইডির মাসিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, খাদ্যবহির্ভূত খাতের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে খেটে খাওয়া মানুষের ওপর এই আর্থিক চাপ আরও ঘনীভূত হওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ক্ষমতাহীনতা ও শ্রমবাজারের এই কাঠামোগত সংকট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিললুর রহমান জানান, নতুন বিনিয়োগের অভাব ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়াই মজুরি না বাড়ার মূল কারণ। বাজারে অতিরিক্ত শ্রমিকের জোগান থাকায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক দরকষাকষির বা ট্রেড ইউনিয়নের সুযোগ না থাকায় মালিকপক্ষ মজুরি বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রদেয় আসল বা প্রকৃত মজুরি বা রিফ্লেক্টেড পারচেজিং পাওয়ার কমে যেতে থাকলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের অনেকেই পুনরায় দারিদ্র্যসীমার নিচে তলিয়ে যেতে পারেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, সার্বিক সমস্যার মূলে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম মজুরি কাঠামো এবং নিয়মিত মজুরি সমন্বয় বা অ্যাডজাস্টমেন্ট ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। শ্রমবাজারে চাহিদার চেয়ে নতুন ও পুরোনো চাকরিপ্রার্থীর জোগান অনেক বেশি হওয়ায় শ্রমিকের দরকষাকষির ক্ষমতা একদমই থাকে না। তাছাড়া সরকারি বিবিএসের মজুরি সূচক মূলত দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিকদের হিসাব ধরে, যা পুরো শ্রমবাজারের বাস্তব চিত্র প্রকাশ করে না। অনানুষ্ঠানিক খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানে কাজ বা ব্যক্তি বদলালেও মজুরির কোনো পরিবর্তন হয় না।
বিবিএসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পোশাক খাতের মতো কিছু আনুষ্ঠানিক খাতে নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো থাকলেও কৃষি, ইটভাটা বা পোলট্রি খাতের মতো অনানুষ্ঠানিক খাতে আইনি সুরক্ষা নেই বললেই চলে। সেখানে পুরুষ শ্রমিকেরা অটো রিকশা চালানোসহ অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তাদেরকে পুরুষদের তুলনায় একই কাজের জন্য কম মজুরি দেওয়া হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কার্যকর মজুরি নীতি বাস্তবায়ন ছাড়া এই টানা সাড়ে চার বছরের মূল্যস্ফীতির দীর্ঘশ্বাস কাটানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

