কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় নতুন একটি অফশোর এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত টার্মিনালটির দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা হবে ৬০০ থেকে ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট বা এমএমসিএফডি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিএনইই)। প্রতিষ্ঠানটি ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতিদিন ৩ লাখ ৪২ হাজার মার্কিন ডলার রিগ্যাসিফিকেশন সেবা ফি নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে।
এই প্রস্তাবের আর্থিক গুরুত্ব বুঝতে বর্তমানে পরিচালিত এলএনজি টার্মিনালগুলোর ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করা প্রয়োজন। দেশে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের জন্য দৈনিক ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের জন্য ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার ফি পরিশোধ করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সে হিসাবে চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত ফি এক্সিলারেট এনার্জির তুলনায় প্রায় ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সামিটের তুলনায় প্রায় ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
দৈনিক ফি বৃদ্ধির বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে সীমিত মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে এর আর্থিক প্রভাব উল্লেখযোগ্য হতে পারে। এক্সিলারেট এনার্জির তুলনায় নতুন প্রস্তাবে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৮৮ হাজার ডলার এবং সামিটের তুলনায় ৯২ হাজার ৮৮৫ ডলার বেশি ব্যয় হবে। বছরে ৩৬৫ দিন ধরে হিসাব করলে এই পার্থক্য যথাক্রমে প্রায় ৩ কোটি ২১ লাখ ২০ হাজার ডলার এবং ৩ কোটি ৩৯ লাখ ২ হাজার ২৫ ডলারে দাঁড়ায়। তবে এটি কেবল দৈনিক নির্ধারিত ফির ভিত্তিতে করা তুলনামূলক হিসাব; প্রকৃত ব্যয় চুক্তির শর্ত, টার্মিনালের সক্ষমতা, সেবার পরিধি ও অন্যান্য আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে।
প্রস্তাবিত ১৫ বছরের মেয়াদে প্রতিদিন একই হারে ফি পরিশোধ করা হলে নতুন টার্মিনালের মোট সেবা ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৮৭ কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। এই হিসাবের মধ্যে সম্ভাব্য মূল্য সমন্বয়, অন্যান্য পরিচালন ব্যয় কিংবা চুক্তির অতিরিক্ত শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে প্রকল্পটির প্রকৃত আর্থিক দায় নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ চুক্তিপত্র ও ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করা জরুরি।
তবে আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো টার্মিনালের মালিকানা কাঠামো। চীনা প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বিল্ড-ওন-অপারেট বা বিওও পদ্ধতি প্রস্তাব করেছে। এই ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান টার্মিনাল নির্মাণ, মালিকানা সংরক্ষণ এবং পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ১৫ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও টার্মিনালের মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তরিত হবে না।
অন্যদিকে, এর আগে আলোচিত কিছু এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পে বিল্ড-ওন-অপারেট-ট্রান্সফার বা বিওওটি পদ্ধতি অনুসরণের পরিকল্পনা ছিল। এই পদ্ধতিতে বেসরকারি বা বিদেশি বিনিয়োগকারী নির্ধারিত সময় পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালনা করলেও চুক্তির মেয়াদ শেষে টার্মিনালের মালিকানা পেট্রোবাংলার কাছে বিনামূল্যে হস্তান্তরের শর্ত রাখা হয়েছিল। ফলে বিওও এবং বিওওটি পদ্ধতির পার্থক্য শুধু পরিচালনার দায়িত্বে সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সম্পদ অর্জন এবং অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এর তাৎপর্য রয়েছে।
বিশেষ করে নতুন প্রস্তাবে তুলনামূলক বেশি সেবা ফি দেওয়ার পরও টার্মিনালের মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে না আসার বিষয়টি অর্থনৈতিক মূল্যায়নে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। একটি অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণে শুধু প্রাথমিক বিনিয়োগ বা বার্ষিক সেবা ফি বিবেচনা করলেই যথেষ্ট নয়। চুক্তির মেয়াদ শেষে সম্পদের অবশিষ্ট মূল্য, ভবিষ্যতে ব্যবহারের সুযোগ, রক্ষণাবেক্ষণের দায় এবং বিকল্প বিনিয়োগের সম্ভাবনাও মূল্যায়ন করতে হয়।
এক্ষেত্রে ২০২৪ সালের মার্চে সামিটের বাতিল হওয়া দ্বিতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের প্রস্তাবটিও গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক উদাহরণ। ওই প্রকল্পের জন্য বিওওটি পদ্ধতিতে দৈনিক ৩ লাখ ডলার সেবা ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল। নতুন চীনা প্রস্তাবে দৈনিক ফি ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার, যা আগের প্রস্তাবের তুলনায় ৪২ হাজার ডলার বা ১৪ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ পূর্ববর্তী প্রস্তাবের চেয়ে বেশি ফি নির্ধারণের পাশাপাশি মালিকানা হস্তান্তরের ব্যবস্থাতেও মৌলিক পরিবর্তন এসেছে।
অবশ্য শুধু দৈনিক ফির পার্থক্য দিয়ে দুটি প্রকল্পের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। টার্মিনালের সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য, নির্মাণকাল, অর্থায়ন ব্যয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিচালন ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। নতুন প্রস্তাবে এসব ক্ষেত্রে বাড়তি কোনো সুবিধা রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হলে অতিরিক্ত ব্যয়ের যৌক্তিকতা আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এলএনজির গুরুত্ব ক্রমেই বেড়েছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহের সীমাবদ্ধতার মধ্যে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য খাতের চাহিদা পূরণে আমদানি করা গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এলএনজি আমদানির সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, পরিবহন ব্যয় এবং টার্মিনাল পরিচালনার মতো একাধিক খরচ যুক্ত থাকে। ফলে সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানির অবকাঠামোগত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করাও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন টার্মিনাল স্থাপিত হলে দৈনিক ৬০০ থেকে ৭৫০ এমএমসিএফডি অতিরিক্ত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এটি দেশের গ্যাস আমদানি অবকাঠামো সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়লেই সমপরিমাণ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হবে, এমন নয়। পর্যাপ্ত এলএনজি আমদানি, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ পাইপলাইন নেটওয়ার্কের প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে নতুন টার্মিনালের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়নের সময় দেশের সম্ভাব্য গ্যাস চাহিদা এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর ব্যবহারক্ষমতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। টার্মিনালের জন্য নির্ধারিত ফি যদি প্রকৃত ব্যবহারের পরিমাণের পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তাহলে পর্যাপ্ত গ্যাস আমদানি না হলেও নির্দিষ্ট ব্যয় বহনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। প্রস্তাবিত চুক্তিতে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, তা প্রকাশিত তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না। তবে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি অবকাঠামো চুক্তিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যাচাইয়ের বিষয়।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরেকটি প্রশ্ন হলো, অতিরিক্ত সেবা ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে। এলএনজি আমদানির মোট ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তা জ্বালানি খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী এই ব্যয় সরকারি সহায়তা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দায় কিংবা গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও প্রস্তাবিত টার্মিনালের বাড়তি ফি সরাসরি ভোক্তাপর্যায়ে গ্যাসের দাম বাড়াবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য এখনো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
এখানে চুক্তির স্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতামূলক ব্যয় যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশিত মুনাফা, অর্থায়নের সুদ, প্রযুক্তিগত ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় সাধারণত সেবা ফি নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। তাই প্রস্তাবিত দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলারের ফি কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং একই সক্ষমতার অন্য কোনো বিকল্প প্রকল্পের তুলনায় এর আর্থিক সুবিধা বা অসুবিধা কী, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি বিওও কাঠামোর অধীনে টার্মিনালের ভবিষ্যৎ ব্যবহারের অধিকার, চুক্তি নবায়নের শর্ত এবং মেয়াদ শেষে পরিচালনার বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। কারণ ১৫ বছরের চুক্তি শেষ হওয়ার পরও যদি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর মালিকানা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ে সেবা গ্রহণ বা নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আলোচনার অবস্থান কী হবে, সেটিও বিবেচ্য বিষয়।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রতিটি আর্থিক শর্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন অবকাঠামো প্রয়োজন হতে পারে, অন্যদিকে সেই অবকাঠামোর ব্যয় যেন দীর্ঘ সময় ধরে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ তৈরি না করে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ফলে সরবরাহ নিরাপত্তা, ব্যয়সাশ্রয় এবং অবকাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই এখানে মূল বিবেচ্য।
প্রস্তাবিত তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল তাই শুধু নতুন একটি জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দায় ও সম্পদের মালিকানা নির্ধারণের সঙ্গেও সম্পর্কিত। বর্তমান টার্মিনালগুলোর তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি ফি এবং বিওও পদ্ধতিতে মালিকানা সংরক্ষণের প্রস্তাব প্রকল্পটির সামগ্রিক আর্থিক মূল্যায়নকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাংলাদেশের জন্য কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে প্রস্তাবিত ব্যয়ের বিপরীতে প্রকৃত সেবা সুবিধা, সরবরাহ সক্ষমতা, চুক্তির শর্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাবের ওপর। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে এসব বিষয় বিস্তারিত পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

