চট্টগ্রামের পটিয়া থানার হাটে প্রতি হাটবারে দুই কোটি টাকার বেশি বেচাকেনা হয়। মাছ, সবজি, মসলা থেকে শুরু করে মাটির তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী, বাঁশ-বেতের পণ্য ও গাছের চারা বিভিন্ন পণ্যের পসরা নিয়ে আসেন দূরদূরান্তের ব্যবসায়ীরা। এই বাজারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কৃষিপণ্য বিপণন, পরিবহন ও খুচরা বিক্রির একটি বহুল ব্যবস্থা। ফলে থানার হাট শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়, আশপাশের এলাকার বহু মানুষের জীবিকারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
পটিয়া পৌরসভার কেন্দ্রস্থলে রেলস্টেশনের পাশে এই হাটের অবস্থান। সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগের সুবিধা থাকায় বিভিন্ন এলাকা থেকে পণ্য আনা এবং ক্রেতাদের এখানে পৌঁছানো তুলনামূলক সহজ। সপ্তাহের শুক্র ও সোমবার হাট বসে। সকাল থেকেই দোকান সাজানো, পণ্য নামানো ও বিক্রির প্রস্তুতি শুরু হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ে। দরদাম, বিক্রেতাদের হাঁকডাক আর পণ্য কেনার ব্যস্ততায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো বাজার।
মাছ ও সবজিতেই বড় লেনদেন
থানার হাটের বাণিজ্যে মাছ ও সবজির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতি হাটবারে মাছ বিক্রি থেকে প্রায় এক কোটি টাকার লেনদেন হয়। সবজিতে বেচাকেনার পরিমাণ ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। অন্যান্য পণ্যের বিক্রি যোগ করলে মোট লেনদেন দুই কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
এই বাজারে সবজির দোকান ছয় শতাধিক। মাছের দোকান রয়েছে একশর বেশি। মুদি ও মসলার দোকান প্রায় একশটি। এ ছাড়া মাংস, শুঁটকি, ফল, পান-সুপারি, পোশাক, মাছ ধরার জাল, গাছের চারা এবং গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকানও আছে। পণ্যের এই বৈচিত্র্যের কারণে সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন বাজার থেকে শুরু করে বিয়ে ও অন্যান্য পারিবারিক আয়োজনের কেনাকাটাও এখান থেকে করেন অনেকে।
এক হাটে মিলছে নানা এলাকার পণ্য
থানার হাটের সরবরাহব্যবস্থা পটিয়ার সীমানায় আটকে নেই। পাইকারদের মাধ্যমে চকরিয়া, চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ার কৃষকদের খেত থেকে সবজি আসে এখানে। চট্টগ্রাম নগরের রেয়াজউদ্দিন বাজার থেকেও পণ্য নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি পটিয়ার স্থানীয় কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করেন। মাছের বাজারেও স্থানীয় পুকুরের মাছের সঙ্গে দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা চালান যুক্ত হয়।
এভাবে বিভিন্ন এলাকার উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের পণ্য একটি বাজারে মিলিত হয়। পাইকারি ক্রেতারা এখান থেকে পণ্য কিনে আবার বিভিন্ন গ্রাম ও খুচরা বাজারে সরবরাহ করেন। ফলে একই পণ্য একাধিকবার হাতবদল হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায় কৃষক, পাইকার, পরিবহনশ্রমিক, দোকানি ও খুচরা বিক্রেতারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকেন। হাটটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব তাই শুধু বিক্রির মোট অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় পণ্য সরবরাহ ও কর্মসংস্থানের একটি শৃঙ্খল।
বিক্রি বেশি হলেই লাভ বেশি নয়
হাটের বড় লেনদেনের আড়ালে রয়েছে ব্যবসায়ীদের পুঁজি ও খরচের হিসাব। পটিয়ার ভাটিকাইন গ্রামের আবদুল জব্বার পেঁয়াজ ও রসুন বিক্রি করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি হাটবারে প্রায় এক লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয়। বিকেল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ক্রেতাদের আনাগোনা থাকে। সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ সোহেলের বিক্রি হয় সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার। শীতকালে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজির সরবরাহ বাড়লে তাঁর বিক্রিও বেড়ে যায় বলে জানান তিনি।
তবে বিক্রির পুরো অর্থ ব্যবসায়ীর আয় নয়। পণ্য কেনার খরচ, পরিবহন, দোকান পরিচালনা এবং পচনশীল পণ্যের সম্ভাব্য ক্ষতি বাদ দিয়ে প্রকৃত লাভ নির্ধারিত হয়। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পণ্য ও বিক্রির পরিমাণভেদে একেক হাটে লাভের অঙ্কে পার্থক্য থাকে। একইভাবে ফসলের মৌসুম, সরবরাহ ও পারিবারিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে চাহিদা বাড়া-কমার প্রভাবও পড়ে বিক্রিতে। তাই বড় অঙ্কের লেনদেন বাজারের বিস্তার বোঝালেও তা দিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রকৃত মুনাফা নির্ধারণ করা যায় না।
পুরোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য
সময় বদলানোর সঙ্গে থানার হাটের পণ্য পরিবহনের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় গরুর গাড়িতে পণ্য আনা হলেও এখন পণ্যবোঝাই ট্রাক আসে বাজারে। কিন্তু আধুনিক পরিবহনের পাশাপাশি মাটির হাঁড়ি-পাতিল, বাঁশ-বেতের কুলা ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর বিক্রিও টিকে আছে। গাছের চারা বিক্রেতা বাবুল দেবনাথের মতো প্রবীণ ব্যবসায়ীরা নিজেদের পণ্য নিয়ে নিয়মিত হাটে বসেন। ছোট পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করার সুযোগও রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম। সূত্রঃপ্রথম আলো

