ব্যাংককে চলমান বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভার সমান্তরাল দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে সার্বিক সহায়তার ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন। অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত পৃথক বৈঠকে মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ঋণ ব্যবস্থাপনা ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে, চীনের এক্সিম ব্যাংক বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরাসরি ইকুইটি ইনভেস্টমেন্ট বা যৌথ বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সফররত সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই আন্তর্জাতিক অংশীদারদের এই আর্থিক ও কৌশলগত সহায়তার একটি দৃশ্যমান অগ্রগতির রূপরেখা বাস্তবায়িত হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ, জ্বালানি তেল এবং সয়াবিনসহ নানা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিপুল আমদানির একটি প্রবৃদ্ধি তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের চড়া হার ও দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে তৈরি হওয়া চাপের ফলে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়েছিল। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সরাসরি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যের পণ্য আমদানি করলেও সেই অনুপাতে ওয়াশিংটন থেকে বড় কোনো রেয়াত বা বিশেষ আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ পাচ্ছে না। বাণিজ্য ঘাটতির এই ভারসাম্যহীনতা কাটাতে ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টকে বিশেষ অনুদান ও সহজ শর্তের কারিগরি সুবিধা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সাথে আইএমএফের বর্তমান ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে ওয়াশিংটনের কৌশলগত প্রভাব থাকায়, মার্কিন সরকারের এই ইতিবাচক অবস্থান অন্যান্য বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা বাড়াতে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।
অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার প্রথাগত ‘সার্বভৌম ঋণ’ বা ডাইরেক্ট গ্যারান্টিযুক্ত সরকারের দেনা বাড়ানোর প্রচলিত নীতি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীনকে কেবল অবকাঠামো ঋণের যোগানদাতা না বানিয়ে তাদের এক্সিম ব্যাংককে সরাসরি ইকুইটি ইনভেস্টমেন্ট এবং জয়েন্ট ভেঞ্চার বা যৌথ ব্যবসায় অংশীদার করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্টের সাধারণ অর্থ হলো, কোনো প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠানে বিদেশি সংস্থা শেয়ার কিনে সরাসরি অংশীদার হবে; যার ফলে প্রকল্পটিতে যদি ভালো ব্যবসা হয়, তবে তারা মুনাফার অংশ বা ডিভিডেন্ড পাবে, আর ব্যবসা খারাপ হলে ক্ষতিও ভাগ করে নেবে। এর মূল সুবিধা হলো, সরকারকে প্রতি বছর কড়ায়-গণ্ডায় সুদে-আসলে ঋণের কিস্তি মেটানোর আলাদা কোনো দায়ভার বহনের ঝুঁকিতে পড়তে হয় না। আগামী সপ্তাহে এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানের ঢাকা সফরের কথা রয়েছে, যেখানে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ও জ্বালানি খাতের সংস্কার নিয়ে বড় ঘোষণার সম্ভাবনা দেখছেন অর্থ সংশ্লিষ্টরা।
সরকার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে স্বীকার করেছে যে, ভঙ্গুর ব্যাংক খাত, রেকর্ড খেলাপি ঋণ এবং অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির এই সংকট উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। তবে এসব লোকানো না হয়ে পুরোপুরি স্বচ্ছতার সাথে অর্থনৈতিক সংস্কারের রোডম্যাপ সাজানো হয়েছে। রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব আলাদা করে কর ফাঁকি রোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া খেলাপি ঋণে জর্জরিত দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত পুনর্গঠন ও গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা দিতে আইনি পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বাজারে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ অর্থায়ন প্যাকেজ ছাড়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ইতিমধ্যে ব্যাংকিং খাতের এই সময়সীমাভিত্তিক রূপরেখা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছে।
বৈঠকের পাশাপাশি আইএমএফ তাদের ‘ফিসক্যাল মনিটর’ ও বৈশ্বিক নীতিগত ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট জানিয়েছে যে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এখন প্রধান শক্তি হলো বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’। তবে তাদের উপযুক্ত শিক্ষা ও নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে না পারলে এটি পরবর্তীতে অর্থনৈতিক চাপে পরিণত হতে পারে। একই সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে শ্রমবাজারে সাময়িক যে ছাঁটাই বা আয়বৈষম্যের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, তা রোধে দক্ষ জনশক্তি তৈরির কোনো বিকল্প নেই। সংস্থাটি ঢালাওভাবে তেলের দাম বা অন্যান্য পণ্যে পাইকারি ভর্তুকি দেওয়া বন্ধ করে, শুধুমাত্র দরিদ্র মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড বা ফার্মার্স কার্ডের মতো সুনির্দিষ্ট ‘টার্গেটেড সোশ্যাল সেফটি নেট’ বা লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার আওতায় সরকারের টাকা খরচের তাগিদ দিয়েছে।

