বিদ্যুৎ খাতের ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ কমাতে গড় ট্যারিফের চেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার জন্য নতুন চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে, যেসব বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিতে গড় দরের চেয়ে বেশি মূল্য নির্ধারিত রয়েছে, সেগুলোর মেয়াদও আর বাড়ানো হবে না। সরকারের আশা, এ পদক্ষেপের ফলে বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় ও ভর্তুকির পরিমাণ কমবে।
গত ৬ অক্টোবর অর্থ বিভাগকে পাঠানো এক চিঠিতে বিদ্যুৎ বিভাগ এ তথ্য জানিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ কেনা ও বিক্রির দামের ব্যবধানের কারণে সরকারের যে আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তা কমাতেই নতুন নীতি নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তিন বছরের সংস্কার পরিকল্পনার অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়নেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভাগটি।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ গড়ে ১২ টাকা ৮০ পয়সায় কিনে ৮ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে প্রতি ইউনিটে সরকারকে ৪ টাকা ৩০ পয়সা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। সংস্থাটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার গড় দাম ছিল প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৫৬ পয়সা।
বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১৩ টাকা ৫৭ পয়সায় এবং ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে ১৪ টাকা ৮৬ পয়সায় কেনা হচ্ছে। আরও কয়েকটি কেন্দ্র থেকেও গড় উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ইতিমধ্যে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, গড় ট্যারিফের ভিত্তিতে নতুন ক্রয়চুক্তি অনুমোদন এবং বিদ্যমান চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ভর্তুকির প্রয়োজন কমতে পারে। তবে এতে কত টাকা সাশ্রয় হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট হিসাব দেওয়া হয়নি।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সময়সীমাবদ্ধ পরিকল্পনা চেয়েছে আইএমএফ। এ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সংস্থাটির নতুন ঋণসহায়তা কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে কর্মসূচিটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রস্তাবিত ঋণের পরিমাণ ৪৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ডলার।
১২–১৮ অক্টোবর ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে নতুন ঋণ কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতের পাশাপাশি কৃষিতে সারের ভর্তুকি ব্যবস্থায় পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারের ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক পান বড় কৃষকেরা। বিপরীতে, মোট কৃষকের ৪০ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক হলেও তাঁরা ভর্তুকির মাত্র ১৩ শতাংশ পান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সারের ভর্তুকি প্রায় চার গুণ বেড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক সারের দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ধীরে ধীরে তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি, কৃষক কার্ডের সঙ্গে বৈদ্যুতিন ভাউচার যুক্ত করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সরাসরি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সারের বিক্রয়মূল্য থেকে ভর্তুকি বাদ না দিয়ে প্রকৃত দামে বিক্রি করা হবে। এর পরিবর্তে যোগ্য কৃষকদের কৃষক কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য কৃষকদের জমির পরিমাণ, চাষাবাদ ও উৎপাদিত ফসলের তথ্য নিয়ে একটি তথ্যভান্ডার তৈরির কাজ চলছে।

