তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নতুন মজুরিকাঠামো ঠিক করতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। বোর্ডের সদস্য বাছাইয়ের জন্য মালিক ও শ্রমিকপক্ষের কাছে নাম চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। গতকাল বৃহস্পতিবার এই চিঠি দেওয়া হয়। একই সময়ে মজুরি বাড়ানোর দাবিতে রাজধানীর উত্তরায় টানা তিন দিন সড়ক অবরোধ করেছেন কয়েকটি কারখানার শ্রমিক। ফলে মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মালিকপক্ষের প্রতিনিধি চেয়ে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধির নাম চেয়ে চিঠি গেছে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতির কাছে। চলতি মাসের শুরুতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের দাবির মুখে মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য বোর্ড গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তখন শ্রম মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, অক্টোবরের মধ্যেই বোর্ড গঠন হতে পারে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠনে তিন ধরনের সদস্য লাগে। এঁরা হলেন একজন নিরপেক্ষ সদস্য, একজন মালিকপক্ষের প্রতিনিধি ও একজন শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি। মন্ত্রণালয় তাই প্রতিটি পদের বিপরীতে তিনজন করে নাম পাঠাতে বলেছে। অর্থাৎ প্রস্তাবিত তালিকা থেকে বেছে নিয়ে সরকার বোর্ডের চূড়ান্ত সদস্য নিয়োগ দেবে।
এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানিয়েছেন, তাঁরা চিঠি পেয়েছেন। তৈরি পোশাকশিল্পের দুই মালিক সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সঙ্গে আলোচনা করে আগামী সপ্তাহের মধ্যে নাম চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তাঁর ভাষ্য, শুরু থেকেই মজুরি বোর্ড গঠনে সরকারের মনোভাব ইতিবাচক। তবু একটি গোষ্ঠী আন্দোলনের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে নিজেদের সুবিধায় কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বলে তিনি মনে করেন। এতে সাধারণ শ্রমিকের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুছ সামাদ আল আজাদ বলেন, মালিকপক্ষের নাম সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকবে এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন। শ্রমিকদের নামের প্রস্তাব সমন্বয় করবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। চিঠিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। তবে দ্রুত নাম পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। তাঁর আশা, দুর্গাপূজার ছুটির আগেই নামগুলো পাওয়া যাবে।
এদিকে মজুরি বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবিতে উত্তরায় আন্দোলন চলছে। গতকাল সকাল সাড়ে আটটার দিকে একাধিক কারখানার শ্রমিকেরা ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের আজমপুর অংশের দুই পাশে অবস্থান নেন। বিক্ষোভের কারণে ওই এলাকায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। টানা তিন দিন ধরে এই অবরোধ চলছে।
মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমাও সম্প্রতি বদলেছে। সরকার শ্রম আইন সংশোধন করে এই মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করেছে। পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৩ সালের নভেম্বরে। তা কার্যকর হয় একই বছরের ডিসেম্বরে। সেই হিসাবে আগামী নভেম্বরে ঘোষণার তিন বছর পূর্ণ হবে। ওই বছর ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। এতে মজুরি বাড়ে ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। একই মজুরিকাঠামোয় আগের সাতটি গ্রেডের জায়গায় পাঁচটি গ্রেড চালু হয়।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে মিল রেখে মজুরি নতুন করে ঠিক করা এবং নতুন কাঠামো দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। গত বুধবার গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের এক সেমিনারে বক্তারা বলেন, ২০১৮ সালে ৮ হাজার টাকায় যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা কেনা যেত, ২০২৬ সালে তা কিনতে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাগছে। কিন্তু শ্রমিকদের আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের খরচ মেটাতে অনেককে বাড়তি সময় কাজ করতে হচ্ছে। তার পরও পরিবারের ন্যূনতম খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তাঁরা মত দেন।
বোর্ডের গঠন নিয়ে শ্রমিকপক্ষের উদ্বেগও স্পষ্ট। গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতারের অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধি শেষ পর্যন্ত কার্যত একই পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর মতে, তাঁরা মালিকদের স্বার্থই দেখেছেন। তাই তিনি বোর্ডে প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধি রাখার দাবি জানান। নিরপেক্ষ সদস্য বাছাই যথাযথ হওয়া জরুরি বলেও মনে করেন তিনি, যাতে সিদ্ধান্ত সত্যিই নিরপেক্ষভাবে নেওয়া যায়। তাঁর ভাষ্য, শ্রমিকদের জীবনমান, খাদ্যদ্রব্যের দাম, মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদনশীলতা বিবেচনায় নিলেই জীবনধারণের উপযোগী মজুরি ঠিক করা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও দুটি বিষয় এখন নজরে থাকবে। প্রথমত, নাম চূড়ান্ত করে পাঠাতে কত সময় লাগে। দ্বিতীয়ত, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধি বাছাই নিয়ে আস্থার সংকট কীভাবে কাটে। কারণ, রাস্তায় শ্রমিকদের চাপ বাড়ছে, আর পরবর্তী মজুরি ঘোষণার তিন বছর পূর্ণ হতে বাকি মাত্র কয়েক সপ্তাহ।

