আজ বিশ্ব খাদ্য দিবস। স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকে বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত ৫২ বছরে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৩৭০ শতাংশ। তবু চাহিদা মেটাতে এখনো আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, বিশেষ করে গম ও ভুট্টার ক্ষেত্রে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আবাদি জমি কমে যাওয়া ও উৎপাদন খরচ বাড়ার কারণে খাদ্যনিরাপত্তা এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে।
স্বাধীনতার পর প্রথম অর্থবছরে (১৯৭২-৭৩) দেশে ৯৯ লাখ ৩০ হাজার টন ধান ও ৯০ হাজার টন গম উৎপাদিত হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ৫২ বছরে ধানের উৎপাদন বেড়েছে ৩০৯ শতাংশ। গমের উৎপাদন বেড়েছে এক হাজার শতাংশেরও বেশি। বিশ্বব্যাংকের আরেকটি হিসাবে, ১৯৭১ সালে চালের উৎপাদন ছিল প্রায় ৯৭ লাখ টন। সাম্প্রতিক সময়ে তা বেড়ে প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ টনে পৌঁছেছে, অর্থাৎ চার গুণেরও বেশি। উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, সারের ব্যবহার ও কৃষি গবেষণার অগ্রগতিকে এই সাফল্যের প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থের তথ্যে সাম্প্রতিক তিন অর্থবছরের চিত্র পাওয়া যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছিল ৪ কোটি ৪৮ লাখ ২৭ হাজার ৫০৭ টন। এর মধ্যে চাল ৩ কোটি ৯০ লাখ ৯৫ হাজার টন, গম ১১ লাখ ৭০ হাজার টন এবং ভুট্টা ৪৫ লাখ ৬২ হাজার ৫০৭ টন। পরের অর্থবছর ২০২৩-২৪-এ উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ৬ লাখ টন চাল, ১১ লাখ ৭২ হাজার টন গম ও প্রায় ৪৮ লাখ ৭৬ হাজার টন ভুট্টা।
সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ তথ্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরের। ওই বছর মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ৭১ লাখ ৭৬ হাজার ৫৩৮ টন। এতে চালের পরিমাণ ৪ কোটি ৬ লাখ ৩০ হাজার টন, গম ১০ লাখ ৪১ হাজার টন এবং ভুট্টা ৫৫ লাখ ৫ হাজার ৫৩৮ টন। লক্ষণীয় যে এ বছর গমের উৎপাদন আগের দুই বছরের চেয়ে কমেছে, আর ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে, ওই অর্থবছরে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ৪ কোটি ৭৬ লাখ টনের মতো হয়ে থাকতে পারে। এর মধ্যে ধান ৪ কোটি ১৫ লাখ টন, গম ১২ লাখ টন এবং বাকিটা ভুট্টা। এটি অনুমানভিত্তিক হিসাব, চূড়ান্ত সরকারি পরিসংখ্যান নয়।
প্রশ্ন হলো, উৎপাদন এত বাড়লেও আমদানি কেন করতে হচ্ছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম এর ব্যাখ্যায় জনসংখ্যার চাপের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরে খাদ্যশস্যের উৎপাদন গড়ে ৩ শতাংশ হারে বেড়েছে। তবে শেষ দুই বছর এই প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে ছিল। তিনি আরও বলেন, ধান, গম ও ভুট্টা এখন শুধু মানুষ খায় না, পশুখাদ্য হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে। পোলট্রি শিল্পে বড় ধরনের বিস্তার ঘটায় এসব শস্যের চাহিদাও বেড়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চাল আমদানি করতে হয় না। আমদানি বেশি হয় গম ও ভুট্টার। এ দুটির চাহিদা দেশে ব্যাপক, কিন্তু সেই হারে উৎপাদন হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্জন যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। চালে দেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি, কিন্তু গম ও ভুট্টায় ঘাটতি বড়। গমের উৎপাদন ১২ লাখ টনের আশপাশে থমকে আছে, অথচ চাহিদা বাড়ছে। ভুট্টার উৎপাদন বাড়লেও পোলট্রি ও পশুখাদ্য খাতের বিস্তারের কারণে তা চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। অর্থাৎ খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নটি এখন শুধু মানুষের খাবারের নয়, পশুখাদ্য ও শিল্পের কাঁচামালের জোগানের সঙ্গেও জড়িত।
আবাদি জমি কমে যাওয়া ও উৎপাদন খরচ বাড়ার বিষয়টিও চাপ বাড়াচ্ছে। জমি কমতে থাকলে একই জমি থেকে আরও বেশি ফলন আদায়ের ওপর নির্ভর করতে হবে। উৎপাদন খরচ বাড়লে কৃষকের লাভ কমে, আর সেটি পরবর্তী মৌসুমে চাষের আগ্রহকেও প্রভাবিত করতে পারে। এর সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি যুক্ত হলে এক মৌসুমের ক্ষতি পুরো বছরের সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্ব খাদ্য দিবসে তাই আলোচনার কেন্দ্রে থাকছে একটি বিষয়, উৎপাদন বাড়ানোর সাফল্যকে কীভাবে টেকসই স্বনির্ভরতায় রূপ দেওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, চালের মতো সাফল্য গম ও ভুট্টায় আনতে হলে আলাদা মনোযোগ দরকার। এখন নজর থাকবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান কী বলে এবং গম ও ভুট্টার উৎপাদন বাড়াতে নীতিনির্ধারকেরা কী উদ্যোগ নেন, তার দিকে।

