আগামী রমজানে সারা দেশে প্রতিদিন ৫২০টি ট্রাকের মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করবে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এতে দেশের প্রায় ৪০ লাখ সুবিধাবঞ্চিত পরিবার উপকৃত হবে বলে জানানো হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার আর্মি গলফ ক্লাবের গলফ গার্ডেনে ‘ট্রেড উইথ টিসিবি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। একই অনুষ্ঠানে সংস্থাটির ডিজিটাল সংস্কার, ভুয়া সুবিধাভোগী বাদ দেওয়া এবং ভর্তুকিনির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত এই বিপণন সংস্থার ওই অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. বদরুন নেসা আহমেদ। প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার ছিল বণিক বার্তা।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, রমজানের এই কার্যক্রমে ট্রাকগুলো বিভিন্ন এলাকায় ভাগ করে মোতায়েন করা হবে। ৫৫টি জেলায় প্রতিদিন পাঁচটি করে ট্রাক থাকবে, অর্থাৎ মোট ২৭৫টি। ১০টি সিটি করপোরেশনে থাকবে ১৫টি করে, মোট ১৫০টি। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৬৫টি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ৩০টি ট্রাক পণ্য বিক্রি করবে। প্রতিটি ট্রাক প্রতিদিন ৪০০ জন ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করবে।
বিশেষ এই কার্যক্রম চলবে ২০ দিন। এ সময় প্রতিটি পরিবার সাশ্রয়ী মূল্যে এক কেজি চিনি, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি ছোলা, দুই লিটার সয়াবিন তেল ও আধা কেজি খেজুর কিনতে পারবে। পাঁচটি পণ্য মিলিয়ে মোট ২৬ হাজার টন খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হবে।
প্রবন্ধে জানানো হয়, স্বল্প আয়ের এক কোটি পরিবারের কাছে প্রতি মাসে ভর্তুকিমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে টিসিবি। এ জন্য ডিজিটাল ডেটাবেজে যাচাই করে ৭৯ লাখ ৯০ হাজার প্রকৃত সুবিধাভোগীকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। প্রায় ৭৩ লাখ ৭ হাজার স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড সক্রিয় করা হয়েছে। ই-কেওয়াইসি ও জাতীয় পরিচয়পত্র মিলিয়ে যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রায় ৫৯ লাখ ভুয়া ও অযোগ্য আবেদন বাতিল করা হয়েছে। আয়োজকদের দাবি, এর ফলে সরকারি পণ্যের অপচয় ও কালোবাজারি পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে।
প্রযুক্তি ব্যবহারের আরও কিছু দিকও তুলে ধরা হয়। সংস্থাটি আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে স্বচ্ছতা বাড়াতে চায়, মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমাতে চায় এবং সরাসরি ব্যাংক এপিআই লেনদেন চালু করেছে। দরপত্র ও পণ্য সংগ্রহে শতভাগ ই-জিপি নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রকাশ্যে দরপত্র খোলা এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে জামানত ও বিল দ্রুত পরিশোধের মাধ্যমে সরবরাহকারীদের জন্য প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করার কথা জানানো হয়।
টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন ও মূল্যের ভারসাম্য রক্ষায় সংস্থাটি পদ্ধতিগতভাবে সারা দেশে পরিধি বাড়িয়েছে। তাঁর ভাষ্য, লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক আধুনিক করা হয়েছে, গুদামজাত অবকাঠামো বাড়ানো হচ্ছে এবং সরবরাহশৃঙ্খলকে গতিশীল করতে ডিজিটাল ব্যবস্থা সমন্বয় করা হচ্ছে। দেশি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে বাজারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
চেয়ারম্যান আরও বলেন, প্রতি মাসে কোটি কোটি আর্থসামাজিকভাবে অসচ্ছল পরিবার ভর্তুকিমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পেতে টিসিবির ওপর নির্ভর করে। রংপুরের রিকশাচালক, গাজীপুরের পোশাকশ্রমিক কিংবা বরিশালের সংগ্রামী বিধবা নারীর জন্য এই সহায়তা পুষ্টিকর খাবার আর চরম অভাবের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়। তাঁর মতে, খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি টিসিবি একটি অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিও, যা দেশজুড়ে মানুষের জীবিকায় ভূমিকা রাখে।
আর্থিক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মানুষ টিসিবি থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করেছে। এর বিপরীতে প্রাতিষ্ঠানিক ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে আনুমানিক আড়াই হাজার কোটি টাকা। চাহিদা বাড়ায় চলতি অর্থবছরে পণ্য কেনার বাজেট বাড়িয়ে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। কাঠামোগত সংস্কার ও পরিচালনগত দক্ষতা বাড়িয়ে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সরকারি ভর্তুকির ওপর টিসিবির নির্ভরতা পুরোপুরি দূর করার লক্ষ্য রয়েছে।
পণ্যের তালিকাও বাড়ানো হচ্ছে। তেল, মসুর ডাল, চিনি, চা ও খেজুরের পাশাপাশি খোলাবাজারে বিক্রির (ওএমএস) মাধ্যমে সাবান, ডিটারজেন্ট, আটা, মসলা ও লবণের মতো প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পণ্য যুক্ত করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, চীন-বাংলা ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ড. ভুঁইয়া মুহাম্মদ হোসেন, অস্ট্রেলিয়ার এমসিজি ইন্টারন্যাশনাল (প্রা.) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মার্ক শেন ম্যাকগোল্ড্রিক, স্কয়ার টয়লেট্রিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মালিক মোহাম্মদ সাঈদ এবং টিকে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার।
হিসাব মিলিয়ে দেখলে কর্মসূচির পরিধি স্পষ্ট হয়। দৈনিক ৫২০টি ট্রাক প্রতিটি ৪০০ জনকে সেবা দিলে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার পরিবার পণ্য পাবে। ২০ দিনে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ লাখের বেশি, যা ঘোষিত উপকারভোগীর সংখ্যার সঙ্গে মেলে। তবে সংখ্যাটি সুবিধাভোগীর মোট তালিকার প্রায় অর্ধেক, কারণ তালিকাভুক্ত সুবিধাভোগী প্রায় ৮০ লাখ।
ভুয়া ও অযোগ্য আবেদন বাতিলের পরিমাণ বিবেচনায় এটি বড় অর্জন, তবে কালোবাজারি ‘সম্পূর্ণভাবে বন্ধ’ হওয়ার দাবিটি আয়োজকদের বক্তব্য হিসেবেই এসেছে। স্বাধীন কোনো মূল্যায়ন এখানে উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে ভর্তুকিমুক্ত হওয়ার লক্ষ্য প্রশংসনীয় হলেও চলতি বছর পণ্য কেনার বাজেট প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি থেকে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়ার অর্থ, আপাতত ব্যয় বাড়ছে। তাই ভর্তুকি কমানোর পথ কেমন হবে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের নাগাল ঠিক থাকবে কি না, সেটি দেখার বিষয়। এখন নজর থাকবে রমজানের আগে ট্রাকগুলোর কার্যকর বিন্যাস, পণ্যের মজুত ও সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ক্রেতাদের দীর্ঘ সারি এড়ানো গেল কি না, তার দিকে।

