মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সাত মাসে জ্বালানি ও সার আমদানিতে বাংলাদেশের বাড়তি ব্যয় হয়েছে ৪১২ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে দেশীয় মুদ্রায় তা প্রায় ৫০ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই দুই পণ্যের আমদানিতে প্রতি মাসে আরও প্রায় ৬০ কোটি ডলার বাড়তি ব্যয় হতে পারে। এই চাপ সামলাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে সংঘাতে সরাসরি জড়িত নয়, অথচ ক্ষতিগ্রস্ত, এমন দেশগুলোর ক্ষতিপূরণের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
আজ শুক্রবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বাংলাদেশের পক্ষে বিষয়টি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি জ্বালানি ও সার আমদানির বাড়তি ব্যয়ের হিসাব দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
তবে ক্ষতিপূরণ নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বাড়তি ব্যয়ের সমপরিমাণ, অর্থাৎ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা, বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কাছ থেকে বাড়তি অর্থায়ন পাওয়ার উদ্যোগ চলছে। কিন্তু ঋণ, অনুদান বা জরুরি সহায়তার মাধ্যমে পাওয়া অর্থকে সরাসরি যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ধরার সুযোগ নেই।
যুদ্ধের অভিঘাত সবচেয়ে স্পষ্ট জ্বালানি ও সার আমদানির ব্যয়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্পকারখানার খরচ বাড়ে। সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনের খরচ এবং সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর একটি অংশ পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে। তিতুমীরের হিসাবে, যুদ্ধ চলতে থাকলে প্রতি মাসে আরও প্রায় ৬০ কোটি ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। ফলে যুদ্ধের মেয়াদ যত বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও তত বাড়বে।
এমনিতেই বাংলাদেশকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে দুর্বলতা ও আর্থিক খাতের সংকট সামলাতে হচ্ছে। এর মধ্যে আমদানি ব্যয় বাড়লে ডলারের জোগান নিশ্চিত করা এবং বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা আরও কঠিন হতে পারে। বাংলাদেশের যুক্তি, যুদ্ধের সিদ্ধান্তে সরাসরি অংশ না নিলেও জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বড় আর্থিক ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে। তাই বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, অনুদান ও জরুরি সহায়তা জরুরি।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগের কথাও জানা গেছে। সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা জানিয়েছেন, জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে ৩০ থেকে ৪০টি দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য জরুরি সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রাথমিকভাবে ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি সংকটকালীন তহবিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে এই সহায়তা সর্বোচ্চ ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ আছে। এ ছাড়া চলমান ও অনুমোদিত প্রকল্পের অর্থ পুনর্বিন্যাস করেও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
নিয়মিত সহায়তার বাইরে আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি আইএমএফের সঙ্গে নতুন তিন বছর মেয়াদি ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলছে। এসব অর্থায়ন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে নির্ধারিত নয়। বরং অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা ও পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ।
ঋণ ও অনুদানের পার্থক্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ঋণ পেলে আমদানি ব্যয়ের চাপ তাৎক্ষণিকভাবে সামলানো সহজ হতে পারে। কিন্তু সেই অর্থ সুদসহ পরিশোধ করতে হবে, ফলে দীর্ঘ মেয়াদে বৈদেশিক ঋণের দায় বাড়তে পারে। অনুদান বা সহজ শর্তের অর্থায়ন পেলে দায় তুলনামূলকভাবে কম হবে। তাই শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, শর্ত, ব্যবহার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও বিবেচনায় রাখা জরুরি। জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ঠেকানো এবং মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সহায়তার মূল লক্ষ্য।
তিতুমীর আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের পাশাপাশি আগের সরকারের আমলের দুর্নীতি, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম এবং দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতির ক্ষতিও কাটিয়ে উঠতে হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া মূল্যস্ফীতি ও যুদ্ধের প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, নিম্ন আয়ের মানুষ আছেন সবচেয়ে বেশি চাপে। তিনি বলেন, যুদ্ধ বাংলাদেশের সৃষ্টি করা সংকট নয়, তবে এর প্রভাব মোকাবিলার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হচ্ছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয়বৃদ্ধির চাপ যেন সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক আছে বলেও জানান তিনি।
দারিদ্র্য মোকাবিলায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচির কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে সহায়তা পৌঁছালে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা এবং নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়া ঠেকানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা জানিয়েছেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছাবে। কিন্তু বর্তমান ধারায় তাদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে আনুমানিক ৪০ কোটি। ফলে প্রায় ৮০ কোটি কর্মসংস্থানের ঘাটতির আশঙ্কা আছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণ জরুরি বলে মত দেন তিনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমদানি ব্যয় বাড়লে শিল্পের উৎপাদন খরচ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য শুধু জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়ার সংকট নয়। এটি বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, সরকারি বাজেট, কৃষি উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সাত মাসে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যয় সেই চাপের মাত্রা দেখিয়ে দেয়। তবে ক্ষতিপূরণের দাবি, জরুরি সহায়তা ও ঋণ, এই তিনটির মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট রাখা জরুরি। কারণ, ক্ষতিপূরণের কোনো নিশ্চিত পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না, আর ঋণ নিলে ভবিষ্যতে দায়ও বাড়বে। এখন নজর থাকবে বিশ্বব্যাংকের সংকটকালীন তহবিল থেকে বাংলাদেশ কতটা ও কী শর্তে সহায়তা পায়, এবং আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির চূড়ান্ত শর্ত কী দাঁড়ায়, তার দিকে।

