দেশের প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষককে ডিজিটাল পরিচয়ের আওতায় আনতে প্রস্তাবিত কৃষক কার্ড কর্মসূচির বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ কর্মসূচিতে বরাদ্দ ৭৫০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষকদের সরকারি ভর্তুকি, প্রণোদনা এবং ব্যাংকঋণ পাওয়ার সুযোগ আরও সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় বরাদ্দ সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। কৃষি খাতের পুষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও সহনশীলতা বৃদ্ধিবিষয়ক কর্মসূচির আওতায় এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রস্তাবটির অনুমোদন এখনো বাকি রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত বরাদ্দ দিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই প্রকল্পের তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাতের অর্থ পুনর্বণ্টন করে কৃষক কার্ডের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কেন বাড়ছে কৃষক কার্ডের বরাদ্দ?
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সাবেক কর্মসূচি সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, কৃষক কার্ড বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ করা ৭৫০ কোটি টাকা পর্যাপ্ত নয় বলে প্রতীয়মান হয়েছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ব্যয় বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
তিনি জানান, বরাদ্দ ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পের কম গুরুত্বপূর্ণ বা অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে বাড়তি অর্থের সংস্থান করা হবে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এতে পুরো প্রকল্পের মোট ব্যয় বাড়বে না। বরং একটি খাত থেকে অন্য খাতে অর্থ স্থানান্তর করেই কৃষক কার্ডের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হবে।
প্রস্তাবিত বরাদ্দের মধ্যে প্রায় ৮০৯ কোটি টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের সুবিধা দেওয়ার কাজে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি অর্থ কৃষকের নিবন্ধন, তথ্য সংগ্রহ, সফটওয়্যার তৈরি এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নের অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা হবে।
২ কোটি ৪০ লাখ কৃষককে কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষককে এই কার্ডের আওতায় আনা হবে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে প্রায় ৪৩ লাখ কৃষককে কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর ২০২৭ সালের মধ্যে অবশিষ্ট কৃষকদেরও কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কৃষক কার্ডে প্রত্যেক কৃষকের জন্য একটি ডিজিটাল পরিচয় তৈরি হবে। এর মাধ্যমে সরকারি কৃষি সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
প্রাথমিকভাবে ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি কৃষকেরা ব্যাংকের ঋণনীতিমালা ও শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কৃষিঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনার অর্থ ফেরত দিতে হবে না। তবে ব্যাংকঋণ নিতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিয়ম ও শর্ত মেনে চলতে হবে।
কৃষকদের নির্ভুল তথ্যভান্ডার তৈরি করা গেলে প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করা এবং তাঁদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সংশোধিত বরাদ্দ অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত কার্ড বিতরণের কার্যক্রম শুরু হয়নি বলে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতিতে উদ্বেগ
কৃষক কার্ড কর্মসূচিটি বৃহত্তর একটি কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ৬ হাজার ৯১০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এতে বাংলাদেশ সরকার, বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল অর্থায়ন করছে।
প্রকল্পটি সাতটি সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অংশে বরাদ্দ রয়েছে ৩ হাজার ৭১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের ৬০ মাসের মেয়াদের মধ্যে ৩৪ মাস, অর্থাৎ ৫৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ সময় পার হয়েছে। কিন্তু এ সময়ে আর্থিক অগ্রগতি ছিল মাত্র ২৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ছিল ৩৭ শতাংশ।
প্রকল্পের উন্নয়ন ব্যয়ের অংশে অগ্রগতি ছিল আরও কম, মাত্র ৯ দশমিক ২১ শতাংশ। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়ের অংশে অগ্রগতি ছিল ২৮ দশমিক ০৪ শতাংশ।
এ ছাড়া মোট ১২২টি ক্রয় প্যাকেজের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে ৪২টি, যা মোট প্যাকেজের ৩৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
এই পরিস্থিতিতে অনুমোদন দ্রুত সম্পন্ন করা, কৃষক স্মার্ট কার্ড ও কৃষি যন্ত্রপাতিসংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু করা, ক্রয়প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং নিয়মিত প্রকল্প পর্যালোচনা সভা আয়োজনের সুপারিশ করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ। পাশাপাশি নিরীক্ষায় উত্থাপিত আপত্তিগুলো নিষ্পত্তির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আবুল কালাম আজাদ জানান, এখন পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ের কৃষি শিক্ষাকেন্দ্র এবং প্রদর্শনীমূলক কার্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কার্ড কর্মসূচির ক্ষেত্রে সংশোধিত বরাদ্দের অনুমোদনের অপেক্ষা রয়েছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের প্রশিক্ষণের প্রধান বিষয় ছিল উত্তম কৃষিচর্চা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন।
প্রকল্পটির আরেকটি লক্ষ্য হলো ফসলের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি সম্প্রসারণ এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরিপ করা এলাকায় ধান ছাড়া অন্যান্য ফসলের আওতাধীন জমির পরিমাণ ৫৬ শতাংশ বেড়েছে, যা ১ লাখ ১১ হাজার ৬৭০ হেক্টরের সমান।
কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা বিতরণ সহজ হতে পারে। তবে শুধু কার্ড চালু করলেই কৃষকদের আর্থিক সংকট দূর হবে না বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান।
তাঁর মতে, প্রকৃত কৃষকদের সঠিক তথ্যভান্ডার তৈরি এবং তাঁদের কাছে যথাযথভাবে সুবিধা পৌঁছানো নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। তবে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি কৃষকদের এসব ব্যয় সামাল দিতে নিয়মিত নগদ সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি আলু ও পেঁয়াজের মতো কৃষিপণ্যের সরকারি ক্রয় বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছেন। এতে মৌসুমে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে কৃষকেরা যেন অস্বাভাবিক মূল্যপতনের শিকার না হন এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান, তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
কৃষি উন্নয়নে আরও যেসব পরিকল্পনা রয়েছে
কৃষক কার্ডের বাইরেও বৃহত্তর প্রকল্পটির আওতায় কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষকদের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে এমন উন্নত ধানের জাত এবং বেশি প্রোটিন ও দস্তাসমৃদ্ধ ধানের জাত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় ৩ লাখ হেক্টর জমিতে উত্তম কৃষিচর্চা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জরিপে অংশ নেওয়া কৃষকদের ৬৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ তাঁদের পাওয়া প্রশিক্ষণকে অত্যন্ত ভালো বলে মূল্যায়ন করেছেন। আর ৭৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা প্রশিক্ষণে অর্জিত জ্ঞান পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, কৃষক কার্ড কর্মসূচি কৃষি সহায়তা বিতরণে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে দ্রুত অনুমোদন, সময়মতো কার্ড বিতরণ, নির্ভুল কৃষক নিবন্ধন এবং প্রকৃত কৃষকদের কাছে আর্থিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার ওপর।

