বিদেশে কাজের সুযোগ খুঁজতে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ পাড়ি জমান। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে গেলেও তাঁদের গন্তব্যের বড় অংশ এখনো কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর মধ্যে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দক্ষ কর্মীর চাহিদা থাকলেও সেই বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি তুলনামূলক ছোট। ফলে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়লেও গন্তব্যের বৈচিত্র্য ও দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান; দুই ক্ষেত্রেই বড় সুযোগ রয়ে গেছে। অভিবাসন খাত নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের নীতির তুলনায় উঠে এসেছে, শুধু বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানো নয়, কোন পেশায়, কোন দেশে এবং কী ধরনের দক্ষতা নিয়ে তাঁরা যাচ্ছেন, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত বণিক বার্তার শফিকুল ইসলামের প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের কর্মী পাঠানোর পরিসংখ্যান ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরা হয়েছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য উদ্ধৃত করে সরকারি সংবাদ সংস্থা বিএসএস জানিয়েছে, ২০২৫ সালে প্রায় ১১ লাখ ১৭ হাজার বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যান। তাঁদের মধ্যে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭১৫ জনের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। অর্থাৎ, ওই বছর বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই গেছেন একটি দেশে। কাতার, কুয়েত ও সিঙ্গাপুরও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার হলেও সৌদি আরবের তুলনায় সেখানে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা অনেক কম। চলতি বছরের চিত্রও একই ধরনের ঘনত্বের ইঙ্গিত দেয়। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বিএমইটির তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশগামী কর্মীদের ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮টি বহির্গমন ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৪৩ জনের গন্তব্য সৌদি আরব। এখানে পূর্ণ বছরের ২০২৫ সালের কর্মী পাঠানোর সংখ্যা এবং ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত ছাড়পত্রের সংখ্যা আলাদা সময়ের হিসাব; তাই দুটিকে সরাসরি সমান ভিত্তিতে তুলনা করা যাবে না। তবে উভয় হিসাবেই সৌদি আরবের প্রাধান্য স্পষ্ট।
এই নির্ভরতার ঝুঁকি শুধু একটি দেশের ভিসানীতি বা নিয়োগের চাহিদার ওপর নির্ভর করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো গন্তব্যে নিয়োগ কমে গেলে, নিয়ম কঠোর হলে অথবা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট তৈরি হলে বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য কর্মী একই সময়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারেন। এতে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। অবশ্য সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার; লক্ষ্য হওয়া উচিত সেখানে কর্মী পাঠানো কমানো নয়, বরং বিদ্যমান বাজার ধরে রেখে আরও বেশি বিকল্প তৈরি করা।
জাপানের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। দেশটির জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক কাঠামো ও বিভিন্ন খাতে শ্রমিকের চাহিদা বিদেশি কর্মীদের সুযোগ তৈরি করছে। ২০২৫ সালের মে মাসে জাপান সফরের সময় বাংলাদেশ থেকে পাঁচ বছরে এক লাখ কর্মী নেওয়ার লক্ষ্য ঘোষণার কথা আলোচনায় আসে। কিন্তু বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বিএমইটির হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে জাপানে গেছেন ১ হাজার ৫৬৪ জন বাংলাদেশি কর্মী এবং ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত গেছেন ১ হাজার ৭৪৮ জন। বড় লক্ষ্যের তুলনায় বাস্তব কর্মী পাঠানোর সংখ্যা এখনো সীমিত।
এখানে শুধু জাপানের শ্রমবাজার খুলে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। সেখানে কাজ পেতে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি জাপানি ভাষা শেখা এবং নির্দিষ্ট খাতের পরীক্ষা পাস করার প্রয়োজন হয়। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম শাখার প্রথম সচিব মো. জয়নাল আবেদীনের বক্তব্য অনুযায়ী, কৃষি খাতে বাংলাদেশি প্রার্থীদের দক্ষতা পরীক্ষায় ফল তুলনামূলক ভালো হলেও ড্রাইভিং, নির্মাণসহ অন্যান্য খাতে পাসের হার কম। জাপানি ভাষার জেএফটি-বেসিক পরীক্ষায় পাসের হার প্রায় ৩০ শতাংশ বলেও তিনি জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এক লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে একটি রোডম্যাপ তৈরির কাজ চলছে। অর্থাৎ সম্ভাবনা থাকলেও ভাষা ও দক্ষতা অর্জনের প্রস্তুতি ছাড়া সেই সুযোগকে কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা কঠিন।
বাংলাদেশের তুলনায় নেপালের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নেপাল থেকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রোমানিয়া ও সাইপ্রাসের মতো গন্তব্যে কর্মী পাঠানোর নজির রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৫ সালের মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, নেপাল ১২টি দেশের সঙ্গে শ্রম অভিবাসনসংক্রান্ত চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক করেছে; আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির প্রস্তুতি চলছিল। এ ধরনের চুক্তি নিয়োগের পথ তৈরি করার পাশাপাশি কর্মীদের অধিকার ও কাজের শর্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয়ের সুযোগও তৈরি করতে পারে। তবে শুধু চুক্তির সংখ্যা দিয়ে কোনো দেশের সাফল্য মাপা যায় না; কর্মী বাস্তবে কতটা যাচ্ছেন, তাঁদের দক্ষতা কী এবং তাঁরা কতটা নিরাপদে কাজ করছেন, সেটিও বিবেচনায় নিতে হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে এক কাতারে ফেলে দেখার সুযোগ নেই। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার শ্রমবাজারে তুলনামূলক বিস্তৃত গন্তব্যের উপস্থিতি দেখা যায়। শ্রীলঙ্কার ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে কুয়েতের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের বিভিন্ন গন্তব্যে কর্মী যাওয়ার তথ্য রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও সৌদি আরবের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি; ২০২৫ সালে দেশটির বিদেশগামী কর্মীদের বড় অংশই ওই দেশে গেছেন। ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার অর্থ এই নয় যে তাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। বরং কোন দেশ কীভাবে নতুন গন্তব্য তৈরি করছে, দক্ষতার স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং নিয়োগের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ছে, সেখানেই তুলনার সুযোগ। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে ভারতের ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানি, জাপান, কাতার, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মী চলাচলসংক্রান্ত সহযোগিতার কথা উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের জন্যও আন্তর্জাতিক চাহিদার সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতার সামঞ্জস্য বাড়ানো জরুরি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ট্যালেন্ট পার্টনারশিপের আওতায় আইএলও ও বাংলাদেশ সরকার স্বাস্থ্য, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিচর্যা, আতিথেয়তা, নির্মাণ ও কৃষিসহ কয়েকটি খাতে দক্ষ কর্মীর জন্য বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের পথ তৈরিতে কাজ করছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য প্রাসঙ্গিক খাতে তিন হাজার অভিবাসী কর্মীর দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সংযোগ তৈরিতে সহায়তা করা। এটি বড় শ্রমবাজারে প্রবেশের একটি পথ হলেও তার কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রশিক্ষণ, দক্ষতার সনদ, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের চাহিদা এবং বাস্তবে কর্মী পাঠানোর অগ্রগতির ওপর।
দীর্ঘ বিরতির পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের ৩১ মে দেশটি বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নিয়োগ স্থগিত করেছিল। পরে ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণা দেয়। মালয়েশিয়া নীতিগতভাবে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও সম্মতি দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিবাসন ব্যয়, কর্মী পাঠানোর সময়সূচি এবং প্রক্রিয়ার কিছু বিষয় তখনো স্পষ্ট ছিল না। এ কারণে বাজার পুনরায় খোলার ঘোষণাকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার আগে নিয়োগ কতটা স্বচ্ছ হচ্ছে এবং কর্মীদের খরচ কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকছে, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই শ্রমবাজারকে কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল রাখার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার বণিক বার্তাকে বলেছেন, সম্ভাবনাময় দেশ চিহ্নিত করার পরও সেগুলোতে কর্মী পাঠানোর বাস্তব পরিকল্পনা এবং কারিগরি শিক্ষাকে শক্তিশালী করার সুস্পষ্ট কর্মপদ্ধতির ঘাটতি রয়েছে। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, কোন দেশে কোন পেশার কর্মী দরকার, কী ধরনের প্রশিক্ষণ ও ভাষাজ্ঞান প্রয়োজন এবং সেই যোগ্যতার স্বীকৃতি কীভাবে মিলবে; এসব প্রশ্নকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে মেলে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন দেশের সঙ্গে শ্রমবাজার খোলা নয়। সৌদি আরবসহ প্রচলিত গন্তব্য ধরে রাখার পাশাপাশি দক্ষ কর্মীর নতুন বাজার তৈরি, ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ উন্নত করা, যোগ্যতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা এবং নিয়োগব্যবস্থার খরচ ও স্বচ্ছতার ওপর নজর দেওয়া জরুরি। রেমিট্যান্সের প্রবাহ ধরে রাখতে কর্মীর সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাঁদের কোন দক্ষতা নিয়ে কোথায় পাঠানো হচ্ছে এবং সংকটের সময় বিকল্প সুযোগ কতটা খোলা থাকছে, সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নতুন বাজারের ঘোষণা তখনই কার্যকর হবে, যখন তা প্রশিক্ষিত কর্মীর বিদেশযাত্রা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও পরিবারের কাছে স্থিতিশীল আয়ের বাস্তব ফলাফলে রূপ নেবে।

