নিম্ন আয়ের দেশগুলোর সরকারকে এখন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর কথা ভাবলেই চলছে না; রাজস্বের বড় একটি অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে আগের নেওয়া ঋণের দায় মেটাতে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগের জন্য অর্থের জোগান দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করেছেন, উচ্চ সুদের হার ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দরিদ্র দেশগুলোর আর্থিক চাপ আরও বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ঋণ পুনর্গঠন দ্রুত করার পাশাপাশি এসব দেশের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। আইএমএফের তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্সের ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর গড় ঋণ পরিশোধ ব্যয় রাজস্বের ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা এক দশক আগে ছিল ৬ শতাংশ।
ঋণের মোট পরিমাণ বা জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত কমলেই একটি দেশের আর্থিক চাপ কমে যাবে, বাস্তবতা সব সময় এমন নয়। ঋণের জন্য সুদ বেশি দিতে হলে কিংবা পুরোনো ঋণ পরিশোধে রাজস্বের বড় অংশ আটকে গেলে নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সংকুচিত হয়। জর্জিয়েভার বক্তব্য অনুযায়ী, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে সুদের হার ও সরকারি বন্ডের মুনাফা বেড়ে যাওয়ার প্রভাব উন্নয়নশীল এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ নেওয়ার খরচেও পড়ছে। এর সঙ্গে খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চ মূল্য, উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাজারে বিনিয়োগে অনীহা যুক্ত হওয়ায় এসব দেশের অর্থায়নের সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সব নিম্ন আয়ের দেশকে এক ধরনের কঠোর ব্যয় সংকোচনের পথে যেতে হবে—এমন নীতির পক্ষে নয় আইএমএফ। বরং কোন দেশের ঋণ কতটা টেকসই, রাজস্ব আয়ের সক্ষমতা কেমন এবং তাৎক্ষণিক অর্থের ঘাটতি কতটা—এসব বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। কারণ, প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বিচারে কমিয়ে দিলে স্বল্পমেয়াদে বাজেটের চাপ কমতে পারে, কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থায়নের সংকট সামলাতে আইএমএফের অন্যতম হাতিয়ার দারিদ্র্য হ্রাস ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা তহবিল (পিআরজিটি)। এই তহবিলের মাধ্যমে যোগ্য নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে বাজারদরের তুলনায় সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হয়। আইএমএফ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে অনুমোদিত সংস্কার প্যাকেজের লক্ষ্য হলো পিআরজিটির দীর্ঘমেয়াদি স্বনির্ভর ঋণদানের সক্ষমতা বছরে ২৭০ কোটি বিশেষ উত্তোলন অধিকার বা এসডিআরে উন্নীত করা; যা মহামারির আগের সক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি। তবে এই ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে সদস্য দেশগুলোর অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি দুর্যোগ বা বড় ধরনের সংকটে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের চাপ কমাতে আইএমএফের রয়েছে বিপর্যয় মোকাবিলা ও ঋণ-স্বস্তি তহবিল (সিসিআরটি)। এই তহবিল থেকে যোগ্য দেশগুলোকে অনুদানের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধে স্বস্তি দেওয়া সম্ভব। জর্জিয়েভা সদস্য দেশগুলোকে এ তহবিলে অর্থ জোগানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ করারও আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, অর্থায়নের প্রয়োজন বাড়লেও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষে উন্নয়ন ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের মধ্যে ভারসাম্য রাখা আরও কঠিন হবে।
যেসব দেশের ঋণ দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধযোগ্য নয়, তাদের ক্ষেত্রে শুধু নতুন ঋণ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। ঋণের শর্ত, মেয়াদ ও পরিশোধের কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জি-২০-এর কমন ফ্রেমওয়ার্কের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে ঋণদাতা দেশ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করে পুনর্গঠন এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী, ঋণ পুনর্গঠনে অযথা বিলম্ব হলে সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হয় এবং নতুন বিনিয়োগের পরিবেশও দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী করতে হবে। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, করব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও ন্যায্য করা, সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা; এসব পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে আইএমএফ। ঋণের চাপ কমানোর স্থায়ী পথ শুধু অর্থায়ন পাওয়া নয়; বরং এমন অর্থনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তোলা, যাতে দেশগুলো নিয়মিত রাজস্ব আয় করতে পারে এবং নতুন ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ছাড়াই উন্নয়ন ব্যয় চালাতে পারে।
ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে আইএমএফের আরেকটি গুরুত্ব হলো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার সময় সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখা। মূল্যস্ফীতি বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় সেবার ব্যয় তুলনামূলক বেশি চাপে পড়ে। আবার সরকারি ব্যয় কমানোর সময় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে কাটছাঁট হলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই রাজস্ব ও ব্যয় সংস্কারের পাশাপাশি লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন জর্জিয়েভা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। তবে প্রযুক্তির সুবিধা সব দেশে সমানভাবে পৌঁছাবে না; দক্ষতা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও বিনিয়োগের ঘাটতি থাকলে নিম্ন আয়ের দেশগুলো আরও পিছিয়ে পড়তে পারে। ফলে ঋণের চাপ সামলানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতার অংশ।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বার্ষিক সম্মেলন ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সম্মেলনের আলোচনায় ঋণ, প্রবৃদ্ধি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দরিদ্র দেশগুলোর সামনে এখন চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী; একদিকে পুরোনো ঋণের দায় মেটানো, অন্যদিকে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ চালিয়ে যাওয়া। ঋণ পুনর্গঠন, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং কার্যকর রাজস্বনীতির সমন্বয় ছাড়া এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

