জুতা উৎপাদনে বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে বাংলাদেশ। ২০২৫ সালে দেশে উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ৫৫ কোটি ৪০ লাখ জোড়া জুতা। এর মাধ্যমে বিশ্বের শীর্ষ ১০ জুতা উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় সপ্তম স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এ তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে চীন, এরপর ভারত ও ভিয়েতনাম।
পর্তুগালের ফুটওয়্যার, যন্ত্রাংশ ও চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারকদের সংগঠন এপিআইসিসিএপিএসের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার ইয়ারবুক ২০২৬’-এ বৈশ্বিক জুতা উৎপাদনের এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে মোট ২ হাজার ৪৬০ কোটি জোড়া জুতা উৎপাদিত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কম। তবে ২০২৪ সালে বিশ্বে জুতা উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছিল।
বিশ্বের মোট জুতা উৎপাদনের ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশই এসেছে এশিয়ার দেশগুলো থেকে। জনসংখ্যা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বড় শিল্পভিত্তির কারণে এশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই জুতা উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
জুতা উৎপাদনে শীর্ষ ১০ দেশ
বিশ্বে উৎপাদিত মোট জুতার প্রায় ৮৯ দশমিক ৫ শতাংশ তৈরি হয় মাত্র ১০টি দেশে। এর মধ্যে চীনের অবস্থান সবচেয়ে শক্তিশালী। ২০২৫ সালে দেশটি ১ হাজার ৩৬৬ কোটি জোড়া জুতা উৎপাদন করেছে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভারত উৎপাদন করেছে ৩০০ কোটি জোড়া জুতা। বিশ্ব উৎপাদনে দেশটির অংশ ১২ দশমিক ২ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামের উৎপাদন ছিল ১৬৫ কোটি ৮০ লাখ জোড়া।
তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে ব্রাজিল, পঞ্চম স্থানে ইন্দোনেশিয়া এবং ষষ্ঠ স্থানে পাকিস্তান। দেশ তিনটি যথাক্রমে ৮৪ কোটি ৮০ লাখ, ৭৮ কোটি ২০ লাখ এবং ৬২ কোটি ৭০ লাখ জোড়া জুতা উৎপাদন করেছে।
বাংলাদেশের উৎপাদন ছিল ৫৫ কোটি ৪০ লাখ জোড়া, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ২ দশমিক ৩ শতাংশ। সপ্তম অবস্থানের পর তালিকায় রয়েছে তুরস্ক, কম্বোডিয়া ও মেক্সিকো।
জুতা রপ্তানিতে চীনের আধিপত্য কমছে
উৎপাদনে শীর্ষ অবস্থানে থাকার পাশাপাশি জুতা রপ্তানিতেও চীন এখনো বিশ্বের প্রধান দেশ। তবে গত এক দশকে বৈশ্বিক রপ্তানিতে দেশটির অংশ কমেছে। ২০২৫ সালে চীন প্রায় ৯০১ কোটি জোড়া জুতা রপ্তানি করেছে, যা বিশ্ব রপ্তানির ৬১ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৬ সালে এই অংশ ছিল ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ।
শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, বাণিজ্যসংক্রান্ত বিরোধসহ বিভিন্ন কারণে চীনের রপ্তানি অংশে পরিবর্তন এসেছে। এ পরিস্থিতিতে চীনের হারানো বাজারের একটি অংশ দখল করছে ভিয়েতনাম।
গত বছর ভিয়েতনাম প্রায় ১৬৬ কোটি জোড়া জুতা রপ্তানি করেছে। বৈশ্বিক রপ্তানিতে দেশটির অংশ ১১ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া ৫৮ কোটি, জার্মানি ৩৬ কোটি এবং ভারত ২৭ কোটি জোড়া জুতা রপ্তানি করেছে।
জুতা রপ্তানিকারক শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ নেই। তালিকায় রয়েছে চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জার্মানি, ভারত, কম্বোডিয়া, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, ইতালি ও তুরস্ক। ফলে উৎপাদনে বাংলাদেশের ভালো অবস্থান থাকলেও আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজারে আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রতি জোড়া জুতার রপ্তানিমূল্যে এগিয়ে ইউরোপ
বিশ্বে রপ্তানি হওয়া মোট জুতার ৮৪ দশমিক ৩ শতাংশ আসে এশিয়া থেকে। অন্যদিকে বৈশ্বিক জুতা রপ্তানিতে ইউরোপের অংশ ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। তবে প্রতি জোড়া জুতার গড় রপ্তানিমূল্যের ক্ষেত্রে ইউরোপের অবস্থান এগিয়ে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপীয় রপ্তানিকারকেরা প্রতি জোড়া জুতা গড়ে ৩৪ দশমিক ৭৬ মার্কিন ডলারে বিক্রি করেছেন। এশীয় রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে গড় মূল্য ছিল ৮ দশমিক ০২ ডলার। অর্থাৎ, উৎপাদন ও রপ্তানির পরিমাণ বেশি হলেও এশিয়ার জুতার গড় রপ্তানিমূল্য ইউরোপের তুলনায় অনেক কম।
আমদানির বাজারেও ইউরোপের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া মোট জুতার ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ আমদানি করেছে ইউরোপ। এ ক্ষেত্রে এশিয়ার অংশ ছিল প্রায় ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং উত্তর আমেরিকার ২০ দশমিক ৩ শতাংশ।
২০১৬ সালে বিশ্ব জুতা আমদানিতে উত্তর আমেরিকার অংশ ছিল ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে এই অংশ কমেছে। বিপরীতে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার অংশ বেড়েছে।
জুতার সবচেয়ে বড় ভোক্তা বাজার এশিয়া
উৎপাদনের পাশাপাশি জুতার ব্যবহারেও এশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় অঞ্চল। ২০২৫ সালে বিশ্বে ব্যবহৃত মোট জুতার ৫৬ শতাংশ ব্যবহার করেছেন এশিয়ার মানুষ। এই চিত্র দেখায়, অঞ্চলটি শুধু উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, একই সঙ্গে বিশাল ভোক্তা বাজারও।
তবে এশিয়ায় মোট জুতার ব্যবহার বেশি হওয়ার পেছনে জনসংখ্যার ভূমিকা বড়। মাথাপিছু ব্যবহারের হিসাবে অঞ্চলটি এখনো উন্নত বাজারগুলোর পেছনে রয়েছে। ২০২৫ সালে এশিয়ায় মাথাপিছু জুতা ব্যবহারের গড় ছিল ২ দশমিক ৬ জোড়া।
অন্যদিকে উত্তর আমেরিকায় একজন মানুষ বছরে গড়ে ৪ দশমিক ৬ জোড়া এবং ইউরোপে ৪ দশমিক ১ জোড়া জুতা ব্যবহার করেছেন। আফ্রিকায় মাথাপিছু ব্যবহারের গড় ছিল মাত্র ১ দশমিক ৬ জোড়া। ক্রয়ক্ষমতা ও সাশ্রয়ী দামের অভাব আফ্রিকায় জুতার চাহিদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম জুতা উৎপাদনকারী হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান শিল্পটির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। তবে উৎপাদনের পাশাপাশি রপ্তানি বাজারে অংশ বাড়ানো এবং তুলনামূলক বেশি মূল্যের জুতা উৎপাদনে সক্ষমতা তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করতে পারলে বাংলাদেশের জুতাশিল্পের সামনে আরও বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।

