বাংলাদেশ রেলের সেবার মান উন্নত করা এবং আর্থিক লোকসান কমানোর উদ্দেশ্যে তিন দশকেরও বেশি আগে বিভিন্ন কার্যক্রম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাশিত সুফল মেলেনি। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীসেবার মান আগের মতোই দুর্বল রয়েছে, কোথাও কোথাও পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। অন্যদিকে ভাড়া বৃদ্ধি ও সরকারের বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরও লোকসানের বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে।
রেলের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে মূল ভাড়া তিন দফায় বাড়ানো হয়েছে। একক ভাড়া প্রায় আড়াই গুণে উন্নীত হলেও একই সময়ে রেলের লোকসান বেড়েছে ১৬ গুণেরও বেশি। বিশেষজ্ঞ ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, এই অভিজ্ঞতা রেলের ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহির ঘাটতি, দক্ষতার অভাব, দুর্বল তদারকি এবং কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এনেছে।
১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত নিউ এজের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
তিন দশক ধরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ
রেলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। ওই বছরের ২১ মার্চ টেকনোহেভেন কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে কম্পিউটারভিত্তিক টিকিট বিক্রি ও আসন সংরক্ষণব্যবস্থা চালু করা হয়। পরে ১৯৯৭ সালে ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ পথে যাত্রীবাহী ট্রেনের বাণিজ্যিক পরিচালনা ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলের ২৮৫টি লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেনের মধ্যে ৩২টি পরিচালনা করছে পাঁচটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো এসআর ট্রেডিং, টিএম ট্রেডিং, এলআর ট্রেডিং, এনএল ট্রেডিং ও এসএ ট্রেডিং।
প্রতিষ্ঠানগুলো রেল নির্ধারিত ভাড়ায় টিকিট বিক্রি করে। অন্যদিকে ইঞ্জিন, কোচ, রেললাইন, প্ল্যাটফর্ম, টিকিট কাউন্টার, সংকেতব্যবস্থা এবং চালক সরবরাহের দায়িত্ব রেলেরই থাকে।
ট্রেনের ভেতরের সেবা, পরিচ্ছন্নতা, খাবার সরবরাহ, তন্তুভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং ট্রেনের অবস্থান পর্যবেক্ষণের মতো কয়েকটি কার্যক্রমও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে।
রেলওয়ে আইন, ১৮৯০ সংশোধনের বিষয়েও আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত ৩৮ ধারায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যৌথ উদ্যোগ এবং বিদেশি রেলওয়ে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রেলপথ ব্যবহারের চুক্তির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
রেলের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ ৪ অক্টোবর নিউ এজকে জানিয়েছিলেন, বছরের শেষ নাগাদ নতুন কেনা যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে রেলপথ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বেসরকারি পরিচালনায় আয় বাড়লেও লোকসান অব্যাহত
রেলের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ট্রেনগুলো থেকে বছরে আয় হতো ১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। বর্তমানে এসব ট্রেন থেকে রেল বছরে ৪১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা পায়। অর্থাৎ রেলের হিসাবে আয় বেড়েছে প্রায় ১৬৫ শতাংশ। তবে টিকিট পরীক্ষক ও বুকিং সহকারীদের পারিশ্রমিক দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে থাকা আয় এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়।
এসব ট্রেনের মধ্যে রয়েছে দেওয়ানগঞ্জ, কর্ণফুলী, মহুয়া, জামালপুর, তিতাস, তুরাগ, সাগরিকা, বালাকা ও পদ্মরাগ কমিউটার ট্রেন; মহানন্দা ও নকশীকাঁথা এক্সপ্রেস; রকেট মেইল, চিলাহাটি এক্সপ্রেস এবং রাজশাহী কমিউটার ও লোকাল ট্রেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, শুধু সংস্কার বা বেসরকারীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক করা কঠিন। তাঁর বক্তব্য, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে নিয়মিত বিপুল অর্থ আয় করতে পারছে—এটি প্রমাণ করে যে ওই খাতে লাভের সুযোগ রয়েছে।
তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, দুর্নীতি কিংবা অবহেলা থাকলে তার আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত সরকার ও জনগণকেই বহন করতে হয়। রেলের বেসরকারীকরণ সেই ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতাকেই সামনে এনেছে।
বাড়ছে পরিচালন ব্যয়, পিছিয়ে আয়
বাংলাদেশ রেলের তথ্যবই অনুযায়ী, ১৯৬৯-৭০ অর্থবছরে পরিচালন কার্যক্রমে ৫ কোটি ২ লাখ টাকা নিট আয় হয়েছিল। ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে সেটি ১১০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা লোকসানে পরিণত হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিট পরিচালন লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭২ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ রেলের তৈরি খসড়া রেলওয়ে মহাপরিকল্পনা ২০২৬–২০৬০ অনুযায়ী, ২০১৫ সালে রেলের পরিচালন ব্যয় ছিল ১ হাজার ৮০৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৪৬ কোটি ২৯ লাখ টাকায়। অর্থাৎ প্রায় ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে একই সময়ে পরিচালন আয় ২০১৫ সালের ১ হাজার ৬০ কোটি ৮২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১ হাজার ৪৭৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা হয়েছে, যা প্রায় ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি।
২০১৫-১৬ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত নয় বছরে রেলের মোট নিট পরিচালন লোকসান হয়েছে ১৫ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। এ সময়ে সরকার বাজেট থেকে বরাদ্দ দিয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৫১ কোটি টাকা।
আয় ও ব্যয়ের এই ব্যবধান দেখাচ্ছে, সরকারি অর্থায়ন অব্যাহত থাকলেও পরিচালন কার্যক্রম থেকে পর্যাপ্ত আয় করতে পারছে না রেল।
কয়েক দফা ভাড়া বাড়িয়েও মিলছে না প্রত্যাশিত ফল
১৯৮৮ সালে রেলের একক ভাড়ার ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৬ পয়সা। ১৯৯২ সালে তা বাড়িয়ে ২৪ পয়সা করা হয়। ২০১২ সালে একক ভাড়া দাঁড়ায় ৩৬ পয়সা এবং ২০১৬ সালে ৩৯ পয়সা।
২০১২ সালের ১ অক্টোবর বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাড়া ৫০ থেকে ১১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। পরে ২০১৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি গড়ে আরও ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে প্রায় ৪৩ বছর পর প্রথমবারের মতো সেতু ব্যবহারের অতিরিক্ত মাশুল সংশোধন করা হয়। এতে টিকিটপ্রতি ভাড়া ৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২২৬ টাকা পর্যন্ত করা হয়।
তারপরও লোকসান কমেনি। বরং রেলের সম্পদ ও অবকাঠামো ব্যবহার করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় প্রায় তিন গুণে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রেন পরিচালনার চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
ট্রেন পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যালয় ও মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রেল কর্তৃপক্ষের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী, এসআর ট্রেডিং, এলআর ট্রেডিং, এনএল ট্রেডিং ও টিএম ট্রেডিংয়ের কার্যালয় ছিল মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার ৭৮ নম্বর ভবনে। টিএম ট্রেডিংয়ের আরেকটি ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল শান্তিনগরের ১১০ নম্বর ভবন।
৩০ আগস্ট সরেজমিনে মতিঝিলের ঠিকানায় শুধু এসআর ট্রেডিংয়ের নামফলক পাওয়া যায়। সেখানে কর্মরত ব্যক্তিরা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। শান্তিনগরের ঠিকানায় কোনো কার্যালয় পাওয়া যায়নি; সেখানে ছিল একটি আবাসিক ভবন।
রেলের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক মাদারীপুরের সালাউদ্দিন রিপন। তিনি ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।
রেলের একজন জ্যেষ্ঠ বাণিজ্যিক কর্মকর্তা জানান, ২০১২ সালে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রথম ট্রেন পরিচালনার চুক্তি পান রিপন। পরে বিভিন্ন মেয়াদে চুক্তির সময় বাড়ানো হয়।
২০২৩ সালে তিনি কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২৭৩ দিন ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার যুক্তি দেখিয়ে ওই সময়ের সমপরিমাণ চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন। আবেদন প্রত্যাখ্যান করে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলে এসআর ট্রেডিং, এনএল ট্রেডিং ও টিএম ট্রেডিংয়ের নামে বাংলাদেশ রেলের বিরুদ্ধে সাতটি মামলা করা হয়। পরে মামলাগুলোর মাধ্যমে স্থগিতাদেশ পাওয়া যায়।
রেলের জ্যেষ্ঠ আইন কর্মকর্তা শখাওয়াত হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, কমিউটার ট্রেনসংক্রান্ত সাতটি মামলা হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। শুনানির পর্যায়ে থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সালাউদ্দিন রিপনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
টিকিট বিক্রিতে প্রযুক্তি, তবু যাত্রীদের অভিযোগ
২০০৭ সালে অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরু হয়। কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেমস লিমিটেড ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা পরিচালনা করে।
এর আগে ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ রেলের সমন্বিত টিকিট ব্যবস্থাপনা পরিচালনার জন্য সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি করা হয়।
তবে যাত্রীরা এখনো টিকিট কেনার সময় প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখে পড়ার অভিযোগ করেন। বিশেষ করে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত শ্রেণির টিকিট কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, কাউন্টার থেকে বিক্রি হওয়া প্রতিটি অনলাইনবিহীন আন্তনগর টিকিটের বিপরীতে যৌথ উদ্যোগটি ২৫ পয়সা কমিশন বা সেবামাশুল পায়।
অনলাইনে বিক্রি হওয়া প্রতিটি আন্তনগর টিকিটের জন্য সহজ ২০ টাকা পায়। এই অর্থের মধ্যে মূল্য সংযোজন কর, ব্যাংক, অর্থ পরিশোধের মাধ্যম এবং বিকাশ ও নগদের মতো সেবাদাতাদের অংশ রয়েছে। এর মধ্যে সহজের নিজস্ব কমিশন ৬ টাকা ৫০ পয়সা।
সহজের টিকিট বিভাগের পরিচালক শাকিল জাওয়াদ রহিম বলেন, যৌথ উদ্যোগটি কাজ শুরু করার সময় প্রায় ২৫ শতাংশ টিকিট অনলাইনে বিক্রি হতো। বর্তমানে সব টিকিটই একই সময়ে অনলাইন ও কাউন্টার—দুই মাধ্যমেই বিক্রির জন্য উন্মুক্ত থাকে।
তিনি জানান, চুক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন স্টেশনে কার্যালয়, পর্যবেক্ষণব্যবস্থা ও অবস্থান নির্ণয়ের প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়েছে। ট্রেনেও প্রয়োজনীয় যন্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে।
রেল কর্তৃপক্ষের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামো পরিচালনার জন্য সফটওয়্যার, যন্ত্রপাতি ও সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে যৌথ উদ্যোগটি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করছে।
খাবার ও পরিচ্ছন্নতা নিয়েও অসন্তোষ
১৯৯৮ সালের ১৪ এপ্রিল ঢাকা–চট্টগ্রাম পথে সুবর্ণ এক্সপ্রেসের ভেতরের সেবা প্রথমবারের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হয়। এরপর ১৯৯৯ সালের ১ জানুয়ারি সব আন্তনগর ট্রেনের পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তবে যাত্রী ও রেল কর্মকর্তাদের অভিযোগ, টিকিট ছাড়া ভ্রমণকারী কিছু যাত্রীর কাছ থেকে বেসরকারি কর্মীরা টাকা নিয়ে তা রেলের কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজেদের কাছে রাখেন।
ঢাকা–চট্টগ্রামসহ কয়েকটি পথে ট্রেনের ভেতরের সেবা ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পর পূর্বাঞ্চলের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে পশ্চিমাঞ্চলে বদলি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিচালন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলেছেন, শুরু থেকেই খাবার সরবরাহের দায়িত্ব বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। তবে কিছু ট্রেনে রেল কর্তৃপক্ষ সীমিত পরিসরে খাবার সরবরাহ করে।
দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীরা খাবারের নিম্নমান নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছেন। ২০২৪ সালের জুনে সিলেট–চট্টগ্রাম পথে চলাচলকারী উদয়ন এক্সপ্রেসে এক নারী যাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তিন কর্মীকে রেল পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
এদিকে ১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রেলের তন্তুভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। পরে মালয়েশিয়াভিত্তিক সানক্রপসের সহায়তায় ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি ট্রেনের অবস্থান পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হয়।
রেলসেবায় দুর্নীতির অভিযোগ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার রেলসেবা নিতে গিয়ে ঘুষসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের জুনে।
ইফতেখারুজ্জামান জানতে চেয়েছেন, লাভজনক হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন রেলের সম্পদ ও সেবা থেকে কাঙ্ক্ষিত আয় হচ্ছে না। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় হয়েছে কি না, কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে অনিয়ম ঘটেছে কি না, তা তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. শামসুল হকের মতে, একক রেলপথের সীমাবদ্ধতা, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এবং পেশাগত দুর্নীতির কারণে বেসরকারীকরণের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, রেল কর্তৃপক্ষের নিজেরা উন্নত সেবা দেওয়ার সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি সেবাদাতাদের কাজের মান নিশ্চিত করার মতো তদারকির সক্ষমতাও দুর্বল। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও স্বচ্ছতা বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীও মনে করেন, খাবার সরবরাহ, টিকিট বিক্রি ও কমিউটার ট্রেন পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দিয়েও যাত্রীদের অভিজ্ঞতায় প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি।
চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের কথা সরকারের
রেলের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ এক লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছেন, যাত্রীসেবা উন্নত করা এবং পরিচালন ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট কিছু পথে ট্রেনের বাণিজ্যিক পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতকে দেওয়া হয়েছিল।
তবে তিন দশকের অভিজ্ঞতায় সেবার মান ও আয় বাড়ানোর লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, তা সরকার গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে বলে তিনি জানান।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত না হলে এবং রেলের আর্থিক স্বার্থ সুরক্ষিত না থাকলে সংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলো নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে।
একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে একাধিক ট্রেন পরিচালনা, একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার এবং প্রকৃত মালিকানা গোপন রাখার অভিযোগকে সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে সরকার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চুক্তি প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম, সংঘবদ্ধ প্রভাব বা গোপন মালিকানা রয়েছে কি না, তা তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব তুলে দিলেই রেলের লোকসান কমানো বা যাত্রীসেবার মান উন্নত করা সম্ভব নয়। কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছ চুক্তি, জবাবদিহি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে সরকারি অর্থের ওপর চাপ বাড়তেই থাকবে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের ঘোষিত পর্যালোচনা ও তদন্ত রেলের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলো সমাধানে কতটা কার্যকর হয়।

