দেশের কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থায়ন বাড়াতে কৃষিঋণ বিতরণ জোরদার করেছে ব্যাংকগুলো। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে কৃষকদের মধ্যে মোট ৬ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে বিতরণের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে কৃষিঋণ বিতরণ বেড়েছে ৪২ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দুই মাসেই পুরো অর্থবছরের কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রার ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ পূরণ হয়েছে। কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলক কম হওয়ায় এ খাতে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর আগ্রহও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যাংকগুলোর জন্য কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগের অর্থবছরে এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন লক্ষ্যমাত্রা আগের বছরের তুলনায় ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি।
কৃষি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করাই এ লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের খাতভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট সময়ে বিতরণ করা মোট কৃষিঋণের সবচেয়ে বড় অংশ পেয়েছে শস্য উৎপাদন খাত। মোট ঋণের ৪৪ শতাংশ গেছে এ খাতে।
অন্যান্য খাতে ঋণ বিতরণের চিত্র হলো—
- শস্য উৎপাদন: ৪৪ শতাংশ
- গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন: ২৬ শতাংশ
- মৎস্য খাত: ১৫ শতাংশ
- দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি: ৪ শতাংশ
- অন্যান্য কৃষি কার্যক্রম: ৯ শতাংশ
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, শস্য উৎপাদনে অর্থায়নকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন ও মৎস্য খাতেও ঋণের প্রবাহ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, কৃষি অর্থায়নের ধরনে ধীরে ধীরে বৈচিত্র্য আসছে।
কৃষিঋণ বিতরণে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এরপর রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বৃদ্ধিই সামগ্রিকভাবে কৃষিঋণের প্রবাহ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
কৃষি খাতে ঋণের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রেও উন্নতি দেখা গেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে ব্যাংকগুলো মোট ৭ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা কৃষিঋণ আদায় করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আদায়ের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৭৩ কোটি টাকা।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কৃষিঋণ আদায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও আগের বছরের তুলনায় বেশি ঋণ আদায় করেছে।
ঋণ বিতরণ ও আদায় বাড়লেও কৃষি খাতের ঋণের সামগ্রিক স্থিতি বেড়েছে। ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে ব্যাংকগুলোর মোট কৃষিঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা।
শুধু আগস্ট মাসেই কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৪ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের আগস্টে এ পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা।
একই মাসে কৃষিঋণ আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের আগস্টের ৩ হাজার ১১৯ কোটি টাকার চেয়ে বেশি।
তবে ঋণের স্থিতি বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষি খাতের ঋণসম্পদের মানের অবনতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থাৎ ঋণ বিতরণ ও আদায় বাড়লেও সামগ্রিক ঋণস্থিতির বৃদ্ধি এবং ঋণের গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও খাদ্যনিরাপত্তায় কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষি খাতের অবদান ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ খাতে কর্মসংস্থান রয়েছে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশের।
জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণেও কৃষির অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, আবাদযোগ্য জমি কমে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব এ খাতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, খাদ্য উৎপাদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও পাকিস্তানের পর।
এ অবস্থায় কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় মেটানো, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, কৃষিপণ্য উৎপাদন বাড়ানো এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কৃষিঋণ বিতরণে ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ কৃষি খাতে অর্থায়ন সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে ঋণ আদায় বাড়াও ইতিবাচক দিক।
তবে শুধু ঋণ বিতরণ বাড়ালেই কৃষি খাতের সব সমস্যা দূর হবে না। ঋণ যেন প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায়, উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত হয় এবং সময়মতো আদায় হয়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন, জমির স্বল্পতা ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় কৃষকদের উপযোগী অর্থায়নব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃষিঋণের সম্প্রসারণকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর করতে হলে ঋণ বিতরণের পরিমাণের পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন, আয় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপরও নজর রাখা প্রয়োজন।

