দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত ও ব্যয়বহুল অবকাঠামো চট্টগ্রামের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল বা কর্ণফুলী টানেল এখন চরম আর্থিক লোকসানের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। মূল সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে (ফিজিবিলিটি স্টাডি) দিনে গড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলাচলের প্রাক্কলন করা হলেও বাস্তবে চলছে তার আট ভাগের এক ভাগ বা মাত্র ৩,৮৬৫টি যানবাহন। এতে করে টানেলের দৈনন্দিন পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ তো উঠছেই না, উল্টো প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উত্থাপিত এক তদারকি প্রতিবেদনে টানেলটির এই করুণ অবস্থা এবং তার পেছনের সুনির্দিষ্ট ১৪টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টানেল সচল রাখতে প্রতিদিন পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ খরচ হচ্ছে গড়ে ২৩ লাখ টাকা, যার বিপরীতে টোল আদায় থেকে দৈনিক আয় আসছে মাত্র ১১ লাখ টাকা। সংসদীয় কমিটিতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে লোকসানের প্রধান কারণ হিসেবে সংযোগ সড়কের সক্ষমতার অভাব, কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়িত না হওয়া, মেরিন ড্রাইভের সঙ্গে সংযোগের অভাব, আনোয়ারা প্রান্তে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন না হওয়া এবং বিনিয়োগ বাস্তবায়নে ধীরগতিকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া সার্বিক পর্যটন সুবিধার ঘাটতি, সার্ভিস এরিয়া অব্যবহৃত থাকা এবং টানেলের মুখে অতিরিক্ত স্কেলিং ও পরিদর্শনের কারণে চালকদের অনীহাকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে এই লোকসানের জট কাটাতে কিছু ইতিবাচক আগাম সম্ভাবনা ও পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে তৈরি করা কর্ণফুলী ড্রাইডকের সাতটি জেটি পুরোপুরি চালু হলে এবং বাস্তবায়নাধীন ‘চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের’ কারখানাগুলোতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে যানবাহনের সংখ্যা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। এতে করে টানেলের বার্ষিক টোল আদায় প্রায় ২০০ থেকে ২৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া আয় বাড়াতে সার্ভিস এরিয়া ইজারা দেওয়া এবং শহর না ছুঁয়ে দূরপাল্লার গাড়িগুলোকে টানেলমুখী করার প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
সংসদীয় কমিটির উক্ত বৈঠকে প্রকল্প মূল্যায়নের পাশাপাশি দেশে চলমান বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ধীরগতি নিয়েও হতাশা প্রকাশ করা হয়। তথ্যে জানানো হয়, গত অর্থবছরে ২৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এডিপি বাস্তবায়নে জাতীয় গড়ের চেয়ে পিছিয়ে ছিল। একই সাথে সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই না করা এবং জমি অধিগ্রহণের জটিলতার কারণে ২৮৮টি প্রকল্পের মেয়াদ নতুন করে বাড়াতে হয়েছে। এসব অবকাঠামোগত দীর্ঘসূত্রতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে অভিজ্ঞ কর্মকর্তা সংকট মেটাতে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ‘প্রকল্প পরিচালক’ নিয়োগে নতুন নীতিমালার খসড়া তৈরি করছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।

