উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে বাংলাদেশের। গত পাঁচ বছরে বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ তিন গুণেরও বেশি হয়েছে। একই সময়ে ঋণের আসল পরিশোধ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা ও সরকারি অর্থায়নের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাম্প্রতিক প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের সুদ বাবদ বাংলাদেশকে ১৫৬ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৯ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
অন্যদিকে, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণের আসল বাবদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ২৯৮ কোটি ডলার। ছয় বছর আগে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫৩ কোটি ডলার।
সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫৩ কোটি ডলার। বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলপথ, সড়ক, নগর রেলব্যবস্থা ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পে বিভিন্ন সরকারের নেওয়া বিদেশি ঋণের দায় এখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
ইআরডির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ ছিল ৪৯ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ১৫৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এই সময়ে সুদ পরিশোধ বেড়েছে ২১৮ শতাংশেরও বেশি।
অন্যদিকে, ঋণের আসল পরিশোধও একই সময়ে প্রায় ৯৫ শতাংশ বেড়েছে।
সুদ পরিশোধের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কয়েক বছর ধরেই অব্যাহত রয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সুদ পরিশোধ বেড়ে ৯২ কোটি ৭ লাখ ৮ হাজার ডলারে দাঁড়ায়। এরপর প্রতিবছরই এ ব্যয় বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ জোগাড়ের পাশাপাশি আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
বিদেশি ঋণ পরিশোধ বাড়লেও বাংলাদেশ এখনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য বৈদেশিক অর্থায়ন পাচ্ছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ৭৪১ কোটি ডলারের বিদেশি ঋণ পেয়েছে। একই সময়ে আগের ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধ করেছে প্রায় ৪৫৩ কোটি ডলার।
অর্থাৎ ঋণ থেকে পাওয়া অর্থের পরিমাণ পরিশোধের তুলনায় বেশি ছিল। ইআরডির তথ্য বলছে, আসল ও সুদ পরিশোধের হিসাব সমন্বয়ের পরও দেশের নিট বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ ইতিবাচক রয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ঋণ পরিশোধের চাপ কম। নতুন ঋণের পাশাপাশি আগের ঋণের দায়ও বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ, বাজেট পরিচালনা এবং বৈদেশিক মুদ্রার জোগান সামলাতে সরকারকে আরও সতর্ক হতে হবে।
গত দেড় দশকে বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলপথ, সড়ক, নগর রেলব্যবস্থা এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বিপুল ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ।
বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানের ঋণে সাধারণত বাণিজ্যিক ঋণের তুলনায় সুবিধাজনক শর্ত থাকে। তবে এসব ঋণের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময় পর আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হয়।
ইআরডির এক কর্মকর্তা জানান, মোট ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগে নেওয়া ঋণগুলো যখন পরিশোধের পর্যায়ে প্রবেশ করে, তখন বছরে আসল ও সুদ বাবদ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর কিছু বিশেষ সুবিধায় কম সুদের অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ সময়ের সঙ্গে সীমিত হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে কোন উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, সুদের হার কত, কত দিন পর পরিশোধ শুরু হবে এবং কত সময়ে ঋণ শোধ করতে হবে—এসব বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিদেশি ঋণ নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হলে, ব্যয় বেড়ে গেলে কিংবা প্রত্যাশা অনুযায়ী আয় ও অর্থনৈতিক সুফল না এলে ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বিদেশি মুদ্রায় নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এক অতিরিক্ত সচিব দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, উৎপাদনশীল অবকাঠামোয় ঋণ বিনিয়োগ দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতিকে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু প্রকল্পে বিলম্ব, অতিরিক্ত ব্যয় কিংবা প্রত্যাশার চেয়ে কম সুফল ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজের মতে, ঋণ ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নে শুধু বার্ষিক পরিশোধের হিসাব দেখলেই হবে না। মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ, মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় ঋণের অনুপাত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি আয়, রাজস্ব আহরণ এবং ঋণ পরিশোধের সময়সূচিও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, প্রকল্প নির্বাচন ও বাস্তবায়নের মান উন্নত করা, রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং রপ্তানি আয় শক্তিশালী করা গেলে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ আরও স্বস্তিদায়কভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।
ইআরডির সর্বশেষ হিসাব বলছে, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে নিতে বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজন থাকলেও নতুন ঋণের খরচ ও সম্ভাব্য সুফল সতর্কভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
যেসব প্রকল্প অর্থনৈতিক উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ বাড়াবে, সেগুলো ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা শক্তিশালী করতে পারে। বিপরীতে, প্রকল্পের সুফল প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে ভবিষ্যৎ বাজেট ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
তাই বাংলাদেশের সামনে এখন একদিকে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা, অন্যদিকে বিদ্যমান ঋণের দায় টেকসই পর্যায়ে রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

