বিশ্বের বড় বড় বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি যখন চাপের মুখে, তখন পোল্যান্ডে রপ্তানি বাড়ার খবর দিচ্ছে নতুন সম্ভাবনার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যে জটিলতা তৈরি হওয়া, চীনা সরবরাহকারীদের কিছু ক্রয়াদেশ হারানো এবং মৌলিক ধরনের পোশাকের চাহিদা—এসব কারণে পোল্যান্ডের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের অবস্থান শক্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোল্যান্ডে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১৮৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বিপরীতে, একই সময়ে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
বড় বাজারগুলোর চিত্রও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। বিশ্বব্যাংক ও ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আর বছরের প্রথম আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
পোল্যান্ডের বাজারে রপ্তানির উত্থান
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাব বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে পোল্যান্ডে বাংলাদেশ থেকে ১৩৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। পরের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২১-২২ সালে তা বেড়ে ২০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি কমে দাঁড়ায় ১৪০ কোটি ডলারে। এরপর আবার ঘুরে দাঁড়ায় বাজারটি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ১৫৪ কোটি ডলারের পোশাক, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ১৬৯ কোটি ডলারে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ১৮৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। যুদ্ধের আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশটিতে ৬৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। তখন রাশিয়াকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ নেমে এসেছে ২৫ কোটি ৭২ লাখ ৬০ হাজার ডলারে।
রাশিয়ায় পোশাক পাঠানোর বিকল্প পথ পোল্যান্ড?
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, পোল্যান্ড থেকে রাশিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পোশাক পুনরায় রপ্তানি হচ্ছে। তাঁর মতে, যুদ্ধের আগে তুরস্কের ব্যবসায়ীরাও বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি করে রাশিয়ায় পাঠাতেন।
তিনি জানান, ২০১১ সালে তুরস্ক বাংলাদেশি পোশাকের ওপর ১৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পর দেশটিতে রপ্তানি কমে যায়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পোল্যান্ডের আমদানিকারকেরা রাশিয়ায় পোশাক পুনরায় রপ্তানি করতে শুরু করেন। এতে পোল্যান্ডে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধিতে ভূমিকা থাকতে পারে।
আইএফএস টেক্সওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালাহ উদ্দিন আহমেদও জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা পোল্যান্ডের কিছু ক্রেতা সেগুলো রাশিয়ায় পুনরায় রপ্তানি করেন। তবে বাংলাদেশ থেকে কেনা পোশাকই রাশিয়ায় পুনরায় পাঠানো হচ্ছে—এমন নির্দিষ্ট প্রমাণ তাঁর কাছে নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, রাশিয়ায় পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে পোল্যান্ড তৃতীয় একটি বাণিজ্যপথ হিসেবে কাজ করতে পারে।
নিষেধাজ্ঞায় জটিল হয়েছে অর্থ পরিশোধ
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নানা বাধা তৈরি করে। এসব নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়ার কয়েকটি ব্যাংকের আন্তর্জাতিক আর্থিক বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থা সুইফট ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়। এতে সীমান্তপারের অর্থ লেনদেন জটিল হয়ে পড়ে এবং রাশিয়ার ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওনা অর্থ আদায়ে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের সমস্যায় পড়তে হয়।
বাংলাদেশের ২৮ জন পোশাক রপ্তানিকারক পোল্যান্ডের এক ক্রেতার কাছ থেকে ৫২ লাখ ডলার পাওনা আদায়ে প্রায় দুই বছর ধরে চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন ফ্যাব্রিকা নিট কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সহসভাপতি মিজানুর রহমান।
পাওনা আদায়ের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত মিজানুর রহমানের ভাষ্য, যুদ্ধের কারণে ওই ক্রেতার ব্যবসা ব্যাহত হয়েছে। ফলে অর্থ পরিশোধের বিষয়টি দীর্ঘায়িত হয়েছে।
চীনের ক্রয়াদেশ হারানোয় সুযোগ পাচ্ছে বাংলাদেশ
পোল্যান্ডে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধির পেছনে শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধই কাজ করছে না বলে মনে করেন রপ্তানিকারকেরা। তাঁদের মতে, চীনা সরবরাহকারীদের কিছু ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে আসায় রপ্তানি বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মিজানুর রহমান বলেন, চীনা সরবরাহকারীদের কাজের আদেশ কমে যাওয়াও পোল্যান্ডে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। পাশাপাশি সাধারণ ব্যবহারের পোশাকের চাহিদাও সেখানে শক্তিশালী রয়েছে।
আইএফএস টেক্সওয়্যারের সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা পোল্যান্ডের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা পান। এই সুবিধা, মৌলিক পোশাকের চাহিদা এবং চীন থেকে ক্রয়াদেশ স্থানান্তরের সম্ভাবনা বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।
সব মিলিয়ে, পোল্যান্ড বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় বাজার হয়ে উঠছে। তবে রাশিয়ায় পুনরায় রপ্তানির ভূমিকা নিয়ে শিল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থাকলেও, পোল্যান্ডে রপ্তানি বৃদ্ধির পুরোটা যে এই কারণেই হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। শুল্কসুবিধা, চাহিদা ও ক্রয়াদেশের পরিবর্তনও এই প্রবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে।

