দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমানোর প্রত্যাশা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল পায়রা সমুদ্রবন্দর। কিন্তু পলি জমে রাবনাবাদ চ্যানেলের গভীরতা কমে যাওয়ায় এখন বড় জাহাজ চলাচলই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চ্যানেলে গভীরতা বাড়ানোর কাজ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই আবার বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করে খননের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত রাবনাবাদ চ্যানেলে গভীরতা বাড়াতে খননকাজ চালানো হয়। কিন্তু তিন বছরের মধ্যেই চ্যানেলটির নাব্যতা আবারও গুরুতর সংকটে পড়ে। এখন চ্যানেলটি সচল করতে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার নতুন খনন প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চ্যানেলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, পলি জমার প্রবণতা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন বিবেচনায় না নিয়ে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে একই ধরনের ব্যয় বারবার ফিরে আসতে পারে। অন্যদিকে, বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ইতিমধ্যে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা এই বন্দর পরিত্যাগ করার সুযোগ নেই। দেশের বন্দরব্যবস্থায় বিকল্প সুবিধা তৈরি করতে পায়রাকে কার্যকর করা জরুরি।
খননের পরও কমেছে চ্যানেলের গভীরতা
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার রাবনাবাদ চ্যানেলের তীরে পায়রা বন্দরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট। প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই চ্যানেলে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় বড় জাহাজ চলাচল এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
বেলজিয়ামভিত্তিক খনন প্রতিষ্ঠান জান ডি নুলকে দিয়ে ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চ্যানেলে গভীরতা বাড়ানোর কাজ করানো হয়। বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিলের প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পরিচালিত প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল চ্যানেলের গভীরতা ১০ দশমিক ৫ মিটারে উন্নীত করা, যাতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতার বড় জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারে।
কিন্তু খনন শেষ হওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই চ্যানেলে দ্রুত পলি জমতে শুরু করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উজান ও হিমালয় অঞ্চল থেকে বছরে প্রায় ৪০ কোটি ঘনমিটার পলি বয়ে আসার বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০২৬ সালের মে মাসের নৌচার্ট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কাঠালধার পয়েন্টে জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে চ্যানেলের গড় গভীরতা নেমে এসেছে ৫ দশমিক ৪ থেকে ৫ দশমিক ৯ মিটারে। স্থান ও জোয়ারের অবস্থা অনুযায়ী সর্বোচ্চ জাহাজ-নিমজ্জন গভীরতা পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিটার।
অথচ আগের খননকাজের আগে চ্যানেলটির স্বাভাবিক গভীরতা ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৬ মিটার। স্থানীয় জেলেদের দাবি, প্রাকৃতিকভাবে সাধারণ সময়ে এখানে ৭ থেকে ৮ মিটার এবং বর্ষায় ১০ মিটারের বেশি গভীরতা থাকত। এ কারণে আগের প্রকল্পের কার্যকারিতা ও পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন করে ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা
বন্দরকে কার্যকর করতে চ্যানেল থেকে প্রায় ১২ লাখ ঘনমিটার পলি সরিয়ে গভীরতা ৯ মিটারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পটি এখনো অনুমোদন পায়নি।
বাংলাদেশ নদী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী এই বন্দর স্থাপনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, সমুদ্রের ভেতরে অবস্থিত রাবনাবাদ চ্যানেল ঘূর্ণিঝড়ের সময় বালুতে ভরে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। তিনি মনে করেন, অবস্থান নির্বাচনের ভুল এবং ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় ঘাটতির কারণে বন্দরের কার্যকারিতা নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কলাপাড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র হাজী হুমায়ুন শিকদারের দাবি, আগের খনন প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় না করে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ খননের ব্যবস্থা করা হলে চ্যানেলটি দীর্ঘ সময় ব্যবহারযোগ্য রাখা যেত। তাঁর মতে, ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নিয়মিত খনন চালিয়ে নাব্যতা বজায় রাখা সম্ভব হতে পারত।
অন্যদিকে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মামুনুর রশিদ মনে করেন, আগের বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার কারণ নির্ণয় না করে নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করলে উন্নয়নের পরিবর্তে পুনরাবৃত্ত ব্যয়ের ঝুঁকি বাড়বে।
তাঁর মতে, শুধু খনন নয়, পলি ব্যবস্থাপনা, পূর্ণাঙ্গ সংযোগ অবকাঠামো, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের সমন্বিত পর্যালোচনা এবং কয়লা পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থার অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতাও যাচাই করা প্রয়োজন।
১০ বছরে আয় ১ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বন্দরটি কাস্টমস ও বন্দর মাশুল মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৯০৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করেছে। এর মধ্যে বন্দরের নিজস্ব রাজস্ব আয় ২৯৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, শুধু আগের চ্যানেল খনন প্রকল্পেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগের খনন প্রকল্পের ব্যয় বন্দরের এক দশকের মোট কাস্টমস ও বন্দর মাশুলের আয়ের তিন গুণেরও বেশি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড এবং আরএনপিএলের কাছে ড্রেজিং লেভি বাবদ পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রায় ৭১৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। তবে বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের প্ল্যান্ট ব্যবস্থাপক শাহ আব্দুল হাসিব জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের সব বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। ড্রেজিং লেভির পাওনার বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
বন্দরে বিদেশি বড় জাহাজ আসার সংখ্যাও কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১১টি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২৩টি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৫টি বিদেশি জাহাজ এসেছিল। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই সংখ্যা নেমে দাঁড়ায় মাত্র ২৯টিতে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ও পণ্য পরিবহনকারী ছোট জাহাজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯৩৩টিতে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি প্রায় দুই বছর পর বন্দরের যন্ত্রপাতি নিয়ে ৪ দশমিক ৫ মিটার গভীরতার একটি জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়েছে।
কয়লা পরিবহনে বাড়তি খরচ, চাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন
পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরএনপিএলের জন্য আমদানি করা কয়লা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চ্যানেলের গভীরতা কমে যাওয়ায় বড় কয়লাবাহী জাহাজ সরাসরি বন্দরে আসতে পারছে না।
নথিপত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের জেটিতে সর্বশেষ কয়লাবাহী বড় জাহাজ এমভি সিনো ওশেন নোঙর করেছিল ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ। এরপর ২০২৬ সালের ১২ মার্চ এমভি থেরেসা গ্রেস বহির্নোঙরে আসে। গভীরতার সীমাবদ্ধতার কারণে ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা বড় কয়লাবাহী জাহাজগুলোকে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ভিড়তে হচ্ছে। সেখান থেকে ছোট জাহাজ ও বাল্কহেডে কয়লা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে।
এই অতিরিক্ত পরিবহনের কারণে প্রতি টন কয়লায় ৩ থেকে ৫ মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়তি খরচ হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়ছে।
বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের প্ল্যান্ট ব্যবস্থাপক শাহ আব্দুল হাসিব বলেন, চট্টগ্রাম থেকে ছোট জাহাজে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কয়লা আনতে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। তাঁর মতে, নতুন খনন প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য নয়, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পণ্য পরিবহন ও খালাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
অবকাঠামোর ঘাটতিও বাধা
চ্যানেলের নাব্যতা সংকটের পাশাপাশি বন্দরের প্রথম টার্মিনাল পর্যন্ত সংযোগ সড়ক এবং আন্ধারমানিক নদীর ওপর সেতুর কাজও এখনো শেষ হয়নি। ফলে বন্দরকে ঘিরে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া জানিয়েছেন, নতুন খনন প্রকল্প এখনো অনুমোদিত হয়নি। তাঁর বক্তব্য, পায়রা বন্দর চালু রাখতে হলে চ্যানেলের নাব্যতা বজায় রাখা জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী জানুয়ারি থেকে বন্দর পুরোদমে কাজ শুরু করবে এবং জাহাজ চলাচল বাড়লে পলি জমার পরিমাণ কমতে পারে।
আগের খনন প্রকল্প সফল না হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে কোনো তদন্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানাতে পারেননি। তিনি আরও জানিয়েছেন, বর্তমানে জোয়ারের সময় চ্যানেলে ৫ থেকে ৬ মিটার পানি থাকে; নতুন প্রকল্পে তা ৮ থেকে ৯ মিটারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল সৈয়দ সাইফ-উল ইসলাম বলেছেন, রাবনাবাদ চ্যানেলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ খননের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই অবগত। এ কারণে নিয়মিত জলজরিপের মাধ্যমে চ্যানেলের গভীরতা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, পায়রা বন্দরের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগের বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বের করা। শুধু নতুন করে খনন করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পলি ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সংযোগ অবকাঠামো এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয়—সবকিছু সমন্বিতভাবে বিবেচনা করেই পরবর্তী বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

